ঢাকা, শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫
Sharenews24

নগ্ন ভিডিও ধারণ করে শাহনাজ চক্রের ব্ল্যাকমেইলিং

২০২৩ আগস্ট ২৩ ১৩:৩৮:০৮
নগ্ন ভিডিও ধারণ করে শাহনাজ চক্রের ব্ল্যাকমেইলিং

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুন্দরী তরুণী। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে চলাফেরা। মিষ্টি কন্ঠে কথা বলে। আচরণে, ফ্যাশনে, কথাবার্তায় যে কাউকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা আছে। আর এগুলোকে পুঁজি করে তিনি চক্রের একজন নারী সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। সমাজের প্রভাবশালী ও ধনী চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে। তার মোবাইল নম্বর এবং ফেসবুক আইডি সংগ্রহ করে। নিজে থেকেই যোগাযোগ করে। একবার কেউ কথা বলা শুরু করলে, তার প্রেমে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না।

সুরেলা কণ্ঠে সব বয়সের পুরুষদের আকর্ষণ করে। দ্রুত তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আপত্তিকর কথা বলে টার্গেট ব্যক্তিকে দুর্বল করে। সময়ে সময়ে ভিডিও কলে এসে নগ্ন হন। মেসেঞ্জারে আপত্তিকর বার্তা এবং ছবি পাঠায়। যখন তিনি বুঝতে পারেন যে ব্যক্তিটি তার প্রতি পুরোপুরি আসক্ত, তখন সে তাকে প্রস্তাব দেয়। যে তার প্রস্তাবে রাজি হয়, তার জীবনে খারাপ সময় আসে। সুন্দরী তাকে একান্ত সময়ের জন্য তার সুবিধাজনক বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পরই তরুণীর আসল পরিচয় বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণী প্রকাশ করে যে সে একটি গ্যাংয়ের সদস্য। কারণ ফ্ল্যাটে ঢোকার পর গ্যাংয়ের অন্য নারী-পুরুষ সদস্যরা হাজির হয়।

তাদের মধ্যে কেউ ডিবি সদস্য, কেউ সাংবাদিক পরিচয় দেয়। এরপর নির্যাতিতাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তার মূল্যবান সবকিছু দখল করে তাকে মারধর করা হয়, উলঙ্গ করা হয়, গ্যাংয়ের নগ্ন মহিলা সদস্যদের সাথে জড়িয়ে ধরে এবং আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তোলা হয়। এরপর নগ্ন ভিডিও ও ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে বেধড়ক মারধর করা হয়। ভুক্তভোগী তখন মর্যাদার ভয়ে টাকার ব্যবস্থা করে। অনেক সময় ভিকটিম তার দখল, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, এটিএম এবং ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা তুলে দেয়। অনেক সময় ভক্ত টাকা এনে তাদের চাহিদা পূরণ করে।

প্রেমের ফাঁদে ফেলে নগ্ন ভিডিও করে এই চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শতাধিক মানুষের সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। হাতিয়েছে কোটি কোটি টাকা। তাদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে বহু মানুষ। তাদের চাহিদামতো টাকা দিতে অপারগ হয়ে অনেকে আইনের শরণাপন্ন হন। এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগের পর তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় ও এক ভুক্তভোগীর মামলার প্রেক্ষিতে ডিবি’র সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ (উত্তর) টানা অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ৮ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।

তারা হলেন, মো. আব্দুস সালাম (৩৮), মো. নাজমুল হাসান (৩০), মো. মাসুম শেখ (৩৫) ও শওকত আলী শেখ (৬০)। তাদেরকে ১৮ই আগস্ট ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা থেকে আটক করা হয়। তারা ৫ দিনের রিমান্ডে আছে। আগামী ২০শে আগষ্ট ঘোষণা করা হয় মো. জহিউর রহমান ওরফে তুষার (৩৩), মো. মাসুদুর রহমান ওরফে মিলন (৪০), মনজুমা বেগম ওরফে শাহিনুর আক্তার ওরফে শাহনাজ (২৮) ও রিমা আক্তারকে (২৫)। তারা ৩ রিমান্ডে আছেন। বিশেষের সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মডেলের ১০টি মোবাইল সেট, ২১টি সিম কার্ড, নগদ ৪১ হাজার টাকা, ১টি স্বর্ণের চেক ও ১টি আংটি উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়া ২০শে আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় মো. জহিউর রহমান ওরফে তুষার (৩৩), মো. মাসুদুর রহমান ওরফে মিলন (৪০), মনজুমা বেগম ওরফে শাহিনুর আক্তার ওরফে শাহনাজ (২৮) ও রিমা আক্তারকে (২৫)। তারা ৩ দিনের রিমান্ডে আছেন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মডেলের ১০টি মোবাইল সেট, ২১টি সিম কার্ড, নগদ ৪১ হাজার টাকা, ১টি স্বর্ণের চেইন ও ১টি আংটি উদ্ধার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মো. জহিউর রহমান ওরফে তুষার এই চক্রের মূলহোতা। চক্রের নারী সদস্যরা টার্গেট ঠিক করে তার কাছে তথ্য দেয়। মো. মাসুদুর রহমান ওরফে মিলন চক্রের সহযোগী হিসেবে ভুয়া ডিবি সদস্যর দায়িত্ব পালন করে। মনজুমা বেগম ওরফে শাহিনুর আক্তার ওরফে শাহনাজ টার্গেট ঠিক করে তাদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার প্রতি আসক্ত করে। রিমা আক্তারও একই কাজ করে। মো. আব্দুস সালাম ভুয়া ডিবি অফিসারের অভিনয় করে। মো. নাজমুল হাসান সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী, মাসুম শেখ ভুয়া ডিবি সদস্যের পরিচয় দেয়।

এছাড়া শওকত আলী শেখ ট্রাপিং এর জন্য ব্যবহার করা গাড়ি ভাড়া করে দেয়। চক্রের নারী সদস্যরা ফেসবুক ও মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে টার্গেট ব্যক্তিদের চক্রের সদস্য শওকত আলী শেখের ভাড়া করা নির্দিষ্ট বাসায় ডেকে নিয়ে যায়। পরে ওই বাসায় ভুক্তভোগীকে আটকে রেখে চক্রের নারী ও পুরুষ সদস্যরা উপস্থিত হয়। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীকে মারধর করে জোরপূর্বক নগ্ন করে চক্রের নগ্ন নারীদের পাশে দাঁড় করিয়ে নগ্ন ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। পরে এসব ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করে।

ডিবি জানায়, চক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কারসহ সবকিছু তাদের কাছে নেয়। পরে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা থাকলে সেগুলো ক্যাশ আউট করে। তারপর ভুক্তভোগীর সঙ্গে যদি ক্রেডিট ও ডেবিড কার্ড থাকে তাহলে সেগুলো দিয়ে টাকা ক্যাশ করে। ক্রেডিট কার্ডের লিমিট অনুযায়ী বিভিন্ন পণ্য কিনে নেয়। এভাবে তারা গত ৪ বছরে অন্তত ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, চক্রের মূল ভুমিকায় থাকতো সুন্দরী নারী সদস্যরা। অন্যান্যরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করতো। আবার নারীরাও টার্গেট করে কথাবার্তা শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে যেকোনো কৌশলে টার্গেট ব্যক্তিকে দুর্বল করে তার প্রতি আসক্ত করা। আর এজন্য ওই নারী সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। বিশেষ করে আপত্তিকর ছবি, ভিডিও, কথা, ভিডিও কলে নগ্ন হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করে টার্গেট ব্যক্তিকে দুর্বল করতো। আর এই কাজ করতো চক্রের শাহনাজ ও রিমা। তারা দু’জনেই এই কাজ ভালো পারতো। প্রতারণা করে যে আয় হতো সেটি তারা কমবেশি করে ভাগাভাগি করে নিত।

এই চক্রের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে এক ভুক্তভোগী উত্তরা পূর্ব থানায় গত ১৬ই আগস্ট পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেছেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেছেন, এক বছর আগে এক বন্ধুর মাধ্যমে শাহনাজের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে ১৫ই আগস্ট শাহনাজ তাকে কৌশলে যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকার একটি বাসার ফ্ল্যাটে যান। তিনি ফ্ল্যাটে যাওয়ার পরপরই অজ্ঞাতনামা ২ জন নারী শাহনাজের বান্ধবী পরিচয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর আরও ৫/৬জন পুরুষ প্রবেশ করে নিজেদেরকে ডিবি পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীকে মারধর করা শুরু করে। তার পরনের কাপড় খুলে জোরপূর্বক নগ্ন অবস্থায় চক্রের নারী সদস্যদের পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে।

একপর্যায়ে তারা তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে এসব ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। তখন চক্রের সদস্যরা তার কাছে থাকা নগদ ৬ হাজার টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ডেবিড ও ক্রেডিট কার্ড জোরপূর্বক হাতিয়ে নেয়। ভুক্তভোগীর কাছ থেকে পিন নিয়ে তারা এটিএম বুথ থেকে ৩ লাখ টাকা তুলে নেয়। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মৌ-প্রিয়া জুয়েলার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ লাখ ৪ হাজার টাকার কেনাকাটা করে। এভাবে তার কাছ থেকে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। পরে মেরে ফেলা ও ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে বাদীকে ভূঁইগড় বাসস্ট্যান্ডে এনে ছেড়ে দেয়।

ডিবির সাইবার ও বিশেষ অপরাধ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আশরাফুল্লাহ বলেন, চক্রটি খুব ভালোভাবে কাজ করতো। বিশেষ করে নারীরা এমনভাবে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতো যাতে নির্যাতিতাদের অন্য কিছু ভাবার সুযোগ থাকতো না। তার প্রলোভন ও আপত্তিকর কথায় অনেকেই দুর্বল হয়ে যেত। পরে একান্তে সময় কাটাতে গিয়ে ধরা পড়েন। অন্তত শতাধিক মানুষকে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছে এই চক্র। তিনি বলেন, এই চক্রের ৮ সদস্য রিমান্ডে রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অল্প সময়ে পরিচিত মানুষদের নিয়ে অপরিচিত জায়গায় না যাওয়াই ভালো। যাওয়ার আগে, পরিবারের সদস্য বা আপনার কাছের কাউকে জানান। ফেসবুকের মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে প্রেম বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনে সতর্ক থাকুন। প্রতারিত হলে অবিলম্বে পুলিশের সহায়তা নিন এবং আইনগত ব্যবস্থা নিন।

শেয়ারনিউজ, ২৩ আগস্ট ২০২৩

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে