ঢাকা, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
Sharenews24

মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ঘিরে যে বিতর্ক রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছিল

২০২৫ মার্চ ২০ ১০:৪৪:২৬
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ঘিরে যে বিতর্ক রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা সফরে আসেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আসা তিনি ছিলেন প্রথম কোনো বিদেশি সরকার প্রধান, এবং এই সফরের সময়ই শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সই হয় ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি। কিন্তু, এই চুক্তি নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বিরোধীরা একে ‘গোলামী চুক্তি’ বলে আখ্যায়িত করেছিল।চুক্তির প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, যুদ্ধের সময়ে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভারত সরকারের সহযোগিতায় গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সহায়তা দেওয়া হয়। পরে, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই বিজয়ের পর শেখ মুজিবুর রহমান ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানাতে তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান।চুক্তি সইয়ের সময়

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় পৌঁছান, এবং তিন দিনের সফরের শেষ দিনে, ১৯ মার্চ, দুই নেতা মুজিব ও গান্ধী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি সই করেন। এই চুক্তিতে দুটি দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাছাড়া, এই চুক্তি ছিল ভারতের সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা চুক্তির আদলে, যার মেয়াদ ছিল ২৫ বছর।

এ চুক্তিতে মোট ১২টি ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা দুই দেশের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা এবং সহযোগিতা নিয়ে ছিল। সেগুলোর মধ্যে ছিল:

একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।

সামরিক জোটে একে অপরকে সমর্থন না করা।

কোনো দেশ অপরের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি এমন কিছু কার্যকলাপে ভূমি ব্যবহার না করবে।

দুই দেশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক, শিক্ষা এবং কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি।

যদিও চুক্তিটি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবুও বিরোধীরা এটিকে ‘গোলামী চুক্তি’ বলে নিন্দা করেছিল। তারা অভিযোগ করেছিল যে, শেখ মুজিব বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। তবে, অনেকের মতে, বিরোধিতার কারণ ছিল মূলত রাজনৈতিক, যেহেতু তখনকার বিরোধী দলগুলো যেকোনো সরকারের উদ্যোগের বিরোধিতা করত।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন, বিশেষ করে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর, এই চুক্তির বাস্তবায়ন বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়। বেশ কিছু ভুল বোঝাবুঝি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এই চুক্তির উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে, এই চুক্তি তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বন্ধুত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।

যদিও চুক্তিটি তখনকার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, ১৯৯৭ সালে যখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়, তখন আর কোনো পক্ষই চুক্তির নবায়ন করতে আগ্রহী হয়নি। তাছাড়া, চুক্তির শর্তগুলোও যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি।

সার্বিকভাবে, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে সহায়ক ছিল, তবে এটি ভবিষ্যতে যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।

আরিফ/

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে