ঢাকা, বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

অবরুদ্ধ এমডি অফিস, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে নজিরবিহীন ঘটনা

২০২৬ জানুয়ারি ২১ ১৮:৩৭:০৪
অবরুদ্ধ এমডি অফিস, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে নজিরবিহীন ঘটনা

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন (৫১ শতাংশ শেয়ার) বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের (বিসিবি) ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কার্যত ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে কাজ করছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যাংকের এক গাড়িচালককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্র অনিয়ম, দুর্নীতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত আদায় করছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন। কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংকের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক হিসেবে বিসিবির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সরকারি তহবিল ও আমানতকারীদের আস্থাও নষ্ট হচ্ছে।

ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টের পর ব্যাংকটি যখন আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করে, তখনই একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। চাকরি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং বেতন-ভাতা বাড়ানোর নামে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রগুলো জানায়, এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের গাড়িচালক আইয়ুব। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এইচআর প্রধান রেজাউল, ট্রেজারার রফিক, সুইফট বিভাগের হান্নান, প্রদান শাখার জাহানারা, অডিট বিভাগের তাপস এবং ক্রেডিট বিভাগের আরিফ, মঈন, সঞ্জয় ও তানিয়া।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাডভাইজরি ও অডিট বিভাগের লিখিত আপত্তি থাকা সত্ত্বেও চাপ প্রয়োগ করে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঘেরাও করে এসব সিদ্ধান্ত আদায় করা হয়।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পদোন্নতিপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা শিক্ষাগত ও পেশাগতভাবে অযোগ্য। কেউ কেউ কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাস, আবার কেউ পূর্বে শাস্তিপ্রাপ্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসে বেতন ও এগ্রিমেন্ট প্রফিট বাবদ প্রায় ৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থ ছাড়ের পেছনে ঘুষ ও সুবিধা লেনদেনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, গালাগালি করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। হেড অফিসে বহিরাগতদের এনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মতিঝিল থানায় জিডি করেন। জিডির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জানুয়ারি বিকেলে বদলি আদেশপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের উদ্দেশে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং হুমকি দেন।

জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত না থাকায় ওই কর্মকর্তারা চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক বদলি আদেশ বাতিল করাতে বাধ্য করেন। এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।

অভিযোগ রয়েছে, ড্রাইভার আইয়ুব ও তার সহযোগীরা ‘বিসিবি কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে ব্যাংকের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন। পাশাপাশি ব্যাংকের তরঙ্গ কমপ্লেক্সে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে আর্থিক লেনদেনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কিছু ইজেড প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদানের ঘটনায় শাস্তির সুপারিশ থাকলেও সংশ্লিষ্ট নথি গোপন রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ব্যাংকের গাড়িচালক বলেন, “আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। এগুলো বড় ম্যানেজমেন্টের বিষয়।”

অন্যদিকে কমার্স ব্যাংকের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান মো. মহসিন মিয়া বলেন, বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। গত ১৮ জানুয়ারি এমডি ও ডিএমডি যৌথভাবে ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করেন। তবে আদেশ পাওয়ার পর কিছু কর্মকর্তা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ডিএমডিকে অবরুদ্ধ করেন এবং হুমকির মাধ্যমে বদলি আদেশ প্রত্যাহারের কাগজে স্বাক্ষর করান, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ডিএমডি মতিঝিল থানায় জিডি করেছেন এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে