ঢাকা, রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

আনন্দ শিপইয়ার্ড ঋণে ইসলামী ব্যাংকের বড় অনিয়ম

২০২৬ জানুয়ারি ১০ ১৯:৫৯:০৭
আনন্দ শিপইয়ার্ড ঋণে ইসলামী ব্যাংকের বড় অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেওয়া বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ঋণ ঘিরে দীর্ঘদিনের ভয়াবহ অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার প্রমাণ মিলেছে। পর্যাপ্ত যাচাই, ঝুঁকি বিশ্লেষণ কিংবা কার্যকর তদারকি ছাড়াই প্রায় দেড় দশক ধরে একের পর এক ধাপে ঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। খেলাপি অবস্থায় পৌঁছানোর পরও কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে ঋণটিকে কৌশলে ‘নিয়মিত’ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে প্রথমে মাত্র ৫১ কোটি ৪ লাখ টাকার নন-ফান্ডেড বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মাত্র ১০ মাসের মাথায় ২০০৭ সালে সেই সীমা এক লাফে বাড়িয়ে ৪৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়, যেখানে বড় অংশ ছিল রিফান্ড গ্যারান্টি। একই বছরের মধ্যেই আরও এক দফা সংশোধনে বিনিয়োগসীমা দাঁড়ায় ৫৪৮ কোটি ১ লাখ টাকায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় অতিরিক্ত ২৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন সুবিধা।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা জামানতের মান যাচাই না করেই এসব অনুমোদন দেওয়া হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু নাসের মুহাম্মদ আব্দুজ জাহের ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফারিদুদ্দিন আহমেদের সময়েই এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। এমনকি ২০০৮ সালে কোনো প্রকল্প মূল্যায়ন ছাড়াই একই বিনিয়োগ সীমার আওতায় আরও চারটি জাহাজ নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হয়।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ইস্যু করা রিফান্ড গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর গাফিলতি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী গ্যারান্টি নবায়ন করার কথা ছিল মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৪২ দিন আগে, কিন্তু ব্যাংক তা করেনি। এর ফলে জার্মান ক্রেতারা গ্যারান্টি দাবি করলে ইসলামী ব্যাংককে ১১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়।

নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থ গ্রাহকের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ হিসেবে দেখানোর কথা থাকলেও ব্যাংক তা দীর্ঘমেয়াদি এইচপিএসএম হিসাবে স্থানান্তর করে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে গুরুতর বিধিলঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ দিয়ে গ্রাহক টঙ্গীতে হেলিপ্যাডসহ একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেন, যা ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত হিসেবে দেখানো হয়নি।

জাহাজ নির্মাণ খাতে আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে ঋণের অন্তত দ্বিগুণ মূল্যের জামানত নেওয়ার রীতি রয়েছে, সেখানে ইসলামী ব্যাংক ৫৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১০ কোটি টাকার জামানত গ্রহণ করে। ব্যাংকের সর্বশেষ নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী বর্তমানে সেই জামানতের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭১ কোটি টাকা।

কিস্তি পরিশোধে সাধারণত সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হলেও আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেওয়া হয় নজিরবিহীন ৬০ মাসের সময়। এর মাধ্যমে বছরের পর বছর ঋণটি ‘নিয়মিত’ দেখানো হয়েছে, যা ব্যাংকিং পরিভাষায় ‘এভারগ্রিনিং’ হিসেবে পরিচিত।

ঋণ আদায় ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী ব্যাংক ২০১৫ সালে গ্রাহকের বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা দায়ের করলেও পরে ব্যাংক নিজেই একাধিকবার মামলাটি স্থগিত রাখতে সহযোগিতা করে, ফলে আইনি প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আনন্দ শিপইয়ার্ডের কাছে ইসলামী ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে মূল বিনিয়োগ ঋণের পরিমাণ ৪২৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, এই ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংক প্রায় সব বিদ্যমান আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে