ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

দীর্ঘ ১৫ বছর পর নিজের মেয়ের পরিচয় অস্বীকার করলেন মা

২০২৬ জুন ০৭ ১২:৫৪:১৬
দীর্ঘ ১৫ বছর পর নিজের মেয়ের পরিচয় অস্বীকার করলেন মা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে এক চিকিৎসক পরিবারের লালনপালনে বড় হওয়া এক তরুণীর পরিচয় ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর বিতর্ক। ১৫ বছর ধরে যাকে নিজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসা হয়েছিল, পরে তাকে ‘পালিত সন্তান’ হিসেবে অস্বীকার করার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসক মায়ের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ এবং পারিবারিক পরিচয়ের নানা নথিতে পরিবর্তন এনে তরুণীর জীবন জটিল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী তরুণী ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল (১৮) দাবি করেছেন, ছোটবেলা থেকে তিনি রাজশাহীর চিকিৎসক দম্পতি ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও ডা. ওবায়দুর রহমানের সন্তান হিসেবে বড় হয়েছেন। তবে পরবর্তীতে পারিবারিক টানাপোড়েনের এক পর্যায়ে তাকে জানানো হয়, তিনি ওই দম্পতির জৈবিক সন্তান নন।

জানা গেছে, ২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জন্মনিবন্ধন করা হয়, যেখানে ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে মা এবং ডা. ওবায়দুর রহমানকে বাবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন তিনি একই পরিচয়ে বেড়ে ওঠেন এবং রাজশাহীর বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।

তবে ২০২২ সালের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় পরিবার থেকে জানানো হয় যে তিনি দত্তক নেওয়া সন্তান এবং তার প্রকৃত পারিবারিক পরিচয় ভিন্ন।

এরপর ২০২৩ সালে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নথিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে তার শিক্ষাগত কাগজপত্র ও অন্যান্য পরিচয় সংক্রান্ত নথিতেও পরিবর্তন আসে বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী পায়েল বলেন, “ছোটবেলা থেকে যাদের মা-বাবা বলে জেনে এসেছি, হঠাৎ তারা আমাকে অস্বীকার করেন। এরপর আমার জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজপত্রে পরিবর্তন আনা হয়। এখন আমার একাধিক নথিতে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় রয়েছে, যা নিয়ে আমি চরম সমস্যায় পড়েছি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরিচয় পরিবর্তনের কারণে তার শিক্ষাজীবনে বাধা সৃষ্টি হয়েছে এবং এক বছর পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড অফিস জানিয়েছে, জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তনের সময় সংশ্লিষ্ট পরিবার থেকে ‘সন্তান সম্পর্কিত আপত্তি’ জানানো হয়েছিল। তবে শুরুতে দেওয়া তথ্য ও পরবর্তী অবস্থান পরস্পরবিরোধী হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়।

ওয়ার্ড সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে একজনকে সন্তান হিসেবে নিবন্ধন করা হলেও পরে সেটিকে অস্বীকার করে সংশোধনের আবেদন করা হয়, যা তাদের কাছেও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আবেগের বশে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জন্মনিবন্ধন করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি আইনি জটিলতা তৈরি করবে বুঝতে পেরে নথি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে সংশোধিত নথিতে যুক্ত হওয়া সম্ভাব্য জৈবিক পিতামাতার পরিচয় নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ পায়েলকে তাদের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের এই পরিচয় সংকটের পেছনে পারিবারিক বিরোধ এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাননি।

আইনজীবীদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি জৈবিক সন্তান না হন, তবে তিনি উত্তরাধিকার আইনে সরাসরি ওয়ারিশ হিসেবে গণ্য নাও হতে পারেন। তবে দীর্ঘদিন একই পরিচয়ে বড় করে পরে তা অস্বীকার করার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ বা আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

লালনপালন, পরিচয় ও আইনি নথির বিরোধে জড়িয়ে পড়া ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জীবন এখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে পারিবারিক পরিচয়—সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ায় তার ভবিষ্যৎ এখন আইনি ও সামাজিক সমাধানের ওপর নির্ভর করছে।

সোহেল রানা/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে