ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

‘বাংলাদেশি’ তকমায় বিপাকে হাজারো পরিবার, নতুন বিতর্ক ভারতে

২০২৬ জুন ০৭ ১১:০২:৫১
‘বাংলাদেশি’ তকমায় বিপাকে হাজারো পরিবার, নতুন বিতর্ক ভারতে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতে নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার ও অভিবাসন প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধের নামে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা। অন্যদিকে ভারত সরকার ও ক্ষমতাসীন বিজেপি বলছে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কেবল বৈধ নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস), সিএএ (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এবং ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা কর্মসূচিকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব প্রক্রিয়ায় বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি অংশকে অতিরিক্তভাবে যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড কিংবা দীর্ঘদিনের বসবাসের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব বা ভোটার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ উঠেছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও ভুয়া পরিচয় শনাক্ত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাভাষী মুসলিম পরিচয়কে অনেক সময় অবৈধ অভিবাসন ইস্যুর সঙ্গে একাকার করে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং বড় শহরগুলোতে কর্মরত কিছু শ্রমজীবী মানুষের অভিযোগ, বাংলা ভাষায় কথা বলা বা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কোনো ব্যক্তির ভাষা, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয় নাগরিকত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না। তবে সরকারি অবস্থান হলো—পরিচয় নয়, বরং বৈধ নথি ও আইনি প্রক্রিয়াই নাগরিকত্ব নির্ধারণের ভিত্তি।

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে অবৈধ অভিবাসন সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাগত ভারসাম্য, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। দলটির নেতারা প্রায়ই ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে রাজনৈতিক বক্তব্যে তুলে ধরেন।

বিজেপির মতে, অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের শনাক্ত করা এবং ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। দলটি বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নয়।

বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ভিন্ন। তাদের মতে, বাস্তবে এসব উদ্যোগের প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের ক্ষেত্রে।

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নাগরিকত্ব যাচাই ও ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে বহু পরিবার আইনি জটিলতায় পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রহীনতা একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো ব্যক্তি যদি নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হন বা রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক অধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন।

যদিও ভারত সরকার বলছে, বৈধ নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই, তবুও নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।

নাগরিকত্ব ও অভিবাসন ইস্যু ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক লোক পাঠানোর অভিযোগ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বলছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রহণের আগে তার নাগরিকত্ব যথাযথভাবে যাচাই করা উচিত।

বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব প্রশ্ন এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নাগরিক-সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং বৈধ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউসুফ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে