ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

ডলার সংকট থেকে ডলার উদ্বৃত্ত: বদলে যাওয়া বাজারের গল্প

২০২৬ জুন ০৭ ১১:১৫:০৪
ডলার সংকট থেকে ডলার উদ্বৃত্ত: বদলে যাওয়া বাজারের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক: কয়েক বছর আগেও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এখন চিত্র ভিন্ন। প্রায় প্রতিদিনই বাজার থেকে কোটি কোটি ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠছে—যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, সেখানে আবার কেন ডলার কিনতে হচ্ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিষয়টি শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর নয়। ডলারের বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রেমিট্যান্স ও রফতানি খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো একাধিক কারণ রয়েছে এর পেছনে।

অনেকেই মনে করেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা থাকা বিপুল পরিমাণ ডলার। বাস্তবে রিজার্ভ গড়ে ওঠে দেশের রফতানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের মাধ্যমে।

তবে এসব ডলার প্রথমে আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি রেমিট্যান্স বা রফতানির অর্থ পায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে রিজার্ভে যোগ করে।

অর্থাৎ রিজার্ভ বাড়াতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাজার থেকেই ডলার সংগ্রহ করতে হয়।বর্তমানে দেশে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রফতানি আয়ের উন্নতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাচার রোধে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে।

যেকোনো পণ্যের মতো ডলারের ক্ষেত্রেও সরবরাহ বেশি হলে দাম কমতে শুরু করে। ডলারের দাম দ্রুত কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রবাসী আয় প্রেরণকারী এবং রফতানিকারকরা।

ধরা যাক, একজন প্রবাসী এক হাজার ডলার দেশে পাঠালেন। ডলারের দাম কমে গেলে তিনি টাকায় কম মূল্য পাবেন। একইভাবে রফতানিকারকরাও তাদের আয়ের বিপরীতে কম টাকা পাবেন।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ তুলে নেয়। ফলে ডলারের দাম হঠাৎ করে কমে যায় না এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা মূলত একটি বাজার ব্যবস্থাপনার কৌশল।একদিকে ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করা হয়, অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ কমিয়ে বিনিময় হারকে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখা হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলারের দাম খুব বেশি বেড়ে যাওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি খুব দ্রুত কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল।

তিন অর্থবছরে ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজারে ছাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, সার ও অন্যান্য জরুরি আমদানির জন্য এই ডলার ব্যবহার করা হয়।

এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়ে আসছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন ডলারের রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করছে এবং বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বাজারে ডলারের দাম অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনে থাকে।

এর ফলে বিনিময় হার চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ে।

* বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়।

* বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে।

* আমদানি ব্যয় নির্বাহ সহজ হয়।

* ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা কমে।

* রেমিট্যান্স ও রফতানি খাত উৎসাহ পায়।

* আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইতিবাচক বার্তা যায়।

তবে শুধু ডলার কেনা বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।

নচেৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা বা বৈদেশিক লেনদেনের নতুন চাপ আবারও ডলারের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ডলার কিনছে মূলত তিন কারণে—রিজার্ভ পুনর্গঠন, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতকে সুরক্ষা দেওয়া।

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ডলার কেনা কোনো সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করার একটি কৌশল।

ইউসুফ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে