×
ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বোনাস নিয়ে সোনালী ব্যাংকে নতুন চাপ, টাকা ফেরতের নির্দেশ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১৮:২৬:৫৭
বোনাস নিয়ে সোনালী ব্যাংকে নতুন চাপ, টাকা ফেরতের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: নীতিমালা লঙ্ঘন করে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া অতিরিক্ত দুই উৎসাহ বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য নিয়মিত তিনটি বোনাসের বাইরে আরও দুটি বোনাস দেওয়া হয়েছিল। বাড়তি দুই বোনাসের মোট অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

বাড়তি বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও দেড় বছর পরও তা আদায় করতে পারেনি সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলী খানকে চিঠি দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। চিঠিতে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই বোনাস পেয়েছেন। নিয়মিত তিনটি উৎসাহ বোনাসের পাশাপাশি তাদের আরও দুটি বোনাস দেওয়া হয়। সাধারণত প্রতিটি বোনাসের পরিমাণ এক মাসের মূল বেতনের সমান হয়ে থাকে। ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি বোনাসের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা হওয়ায় বাড়তি দুই বোনাসের মোট অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ওই নির্দেশের পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি বলে জানা গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের প্রযোজ্য নীতিমালায় সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এরপরও ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি বোনাস দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ব্যাংক সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বোনাস নিয়ে সোনালী ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আন্দোলন হয়। ৭ আগস্ট ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অবরুদ্ধ করেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তাদের অন্যতম দাবি ছিল বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া। তবে তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

পরবর্তীতে বোনাসের দাবিকে কেন্দ্র করে ২০ আগস্ট ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করেছিল বলে জানা যায়। বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তিও ওঠে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও এই বোনাস দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।

বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায়। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নীতিমালার বাইরে গিয়ে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও বিষয়টি উঠে আসে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদনের পর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জন্য আরও ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব উৎসাহ বোনাস নীতিতেও তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ সভায় পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি অনুযায়ী, ওই অনুমোদন শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে হবে—এমন শর্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও সিইও শওকত আলী খান জানিয়েছেন, পাঁচটি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু অর্থ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে, তাই বিষয়টি সরকারকে মেনে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে এবং আবারও একই অনুরোধ জানানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জারি করা নতুন নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট কিছু সূচকের ভিত্তিতে কর্মীদের মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সোনালী, অগ্রণীসহ ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার আগে পাঁচটি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। সূচকগুলো হলো—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানত বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিম বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।

ফলে সোনালী ব্যাংকের অতিরিক্ত বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার সর্বশেষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রায় ১১৬ কোটি টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে অর্থ আদায় ও সমন্বয়ের চূড়ান্ত পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে