×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের ঋণমান নিয়ে বড় সুখবর দিল মুডি’স

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৯:৪০:৫১
বাংলাদেশের ঋণমান নিয়ে বড় সুখবর দিল মুডি’স

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেগেটিভ’ বা নেতিবাচক থেকে ‘স্ট্যাবল’ বা স্থিতিশীল করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স রেটিংস। রাজনৈতিক ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক চাপ কমে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়া এবং রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতায় এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডি’স বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘ইস্যুয়ার’ ও ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিং বি২-এ অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’ বহাল রাখা হয়েছে।

মুডি’স জানিয়েছে, যেসব ঝুঁকির কারণে আগে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক করা হয়েছিল, সেগুলো বর্তমানে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় এসেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নতুন সরকারের পক্ষে শক্তিশালী জনসমর্থন সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি কমিয়েছে বলেও মনে করছে সংস্থাটি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এর ফলে বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও কিছুটা বেড়েছে। আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে মুডি’স।

মুডি’স-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।তবে মূল্যস্ফীতি কমে আসার আগে তা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সার্বিক পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডি’স। সাম্প্রতিক সংস্কারের পর ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ পুনঃমূলধনীকরণে প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

মুডি’স-এর মতে, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়তে থাকলে এই বিপুল মূলধন জোগানের চাপ সরকারের বাজেটের ওপর পড়তে পারে। তবে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ হওয়ায় তারল্য পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা তারল্য নয়; বরং মূলধন ও সচ্ছলতার ঘাটতি।

বাংলাদেশের সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের ভিত্তি বিশ্বের অন্যান্য ঋণমান নির্ধারিত দেশের তুলনায় অন্যতম সংকীর্ণ বলে উল্লেখ করেছে মুডি’স। সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশে থাকলেও সংগৃহীত রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতকে সহায়তা দিতে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় এবং রাজস্ব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। তবে সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ সুবিধা অব্যাহত থাকলে সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডি’স। সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি আমদানি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের সংকট দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে।

এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ রপ্তানি সক্ষমতা এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। তবে তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হিসেবে থাকবে বলে আশা করছে মুডি’স।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সক্ষমতার উন্নতি হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঋণমান আরও উন্নত হতে পারে।

অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের বড় দায় সরকারের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করা, প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব পরিস্থিতির অবনতি, বৈদেশিক অর্থায়ন সংকুচিত হওয়া কিংবা নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশের ঋণমানের ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মুডি’স-এর এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত দিলেও ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব সংগ্রহ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে