×
ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমুদ্রসীমায় ভয়াবহ লুটপাট,  বাংলাদেশের গ্যাস চুরি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১৫:৪৭:৫০
সমুদ্রসীমায় ভয়াবহ লুটপাট,  বাংলাদেশের গ্যাস চুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব সম্পদ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। জ্বালানি চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের গ্যাস সংকটও তীব্র হচ্ছে। ফলে নিজস্ব সমুদ্রসীমায় থাকা সম্ভাব্য গ্যাসসম্পদ কাজে লাগাতে না পারা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের অংশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনার কথা উঠে আসছে। এসব সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।

‘স্ট্র-ইফেক্ট’ একটি ধারণার উদাহরণ, সেখানে একটি গ্লাসে থাকা তরল দুই ব্যক্তি আলাদা দুটি স্ট্র দিয়ে পান করলে যে আগে টানবে, তার কাছে তরল দ্রুত পৌঁছাতে পারে। একই ধরনের ধারণা সমুদ্রের ভূ-তাত্ত্বিক গ্যাস কাঠামোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে এই উদাহরণ বাংলাদেশের গ্যাস ‘চুরি’ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ ।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার কাছাকাছি ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ করেছে। এ কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার গ্যাস অন্য দেশের উত্তোলনের কারণে সরাসরি কমে যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ও গ্যাসের চলাচল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বিস্তারিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ও উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। স্থলভাগের তুলনায় সমুদ্রের গভীরে গ্যাস অনুসন্ধান অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল। এজন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান এগোয়নি—এমন সমালোচনাও রয়েছে।

এদিকে দেশের গ্যাসের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর এর প্রভাব রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক বিষয়টিও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে এলএনজি আমদানি, আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্য এবং সমুদ্রসীমায় সম্পদ অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলন ঠেকিয়ে রাখছে—এমন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য গ্যাসসম্পদ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ, স্বচ্ছ নীতিমালা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি সমুদ্রসীমায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কার্যক্রমের প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক গবেষণাও জরুরি।

নিজস্ব গ্যাসসম্পদ উত্তোলনে অগ্রগতি হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বঙ্গোপসাগরের গ্যাসসম্পদ, আন্তঃসীমান্ত গ্যাস প্রবাহ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোকে পৃথকভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে