×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একে অপরের শক্তি থেকে শিক্ষা নিতে পারে ভারত-চীন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৬:০৮:৩৯
একে অপরের শক্তি থেকে শিক্ষা নিতে পারে ভারত-চীন

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ভারত ও চীনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দেখা গেল নয়াদিল্লিতে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম শি জিনপিং ভারত সফরে এলেন। ফলে বৈঠকটি শুধু ব্রিকস সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর দিকে নজর ছিল পুরো এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনের।

দুই নেতার আলোচনায় সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, যোগাযোগ, জনগণের মধ্যে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগ—সবকিছুই গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে দুই দেশকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হিসেবে দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় ঘটনা ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ। ওই সংঘর্ষের পর দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা তীব্র হয় এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও মানুষের যাতায়াতেও নানা বিধিনিষেধ আসে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে সীমান্তে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২০২৬ সালের আগস্টে ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের ওয়াং ইর মধ্যে সীমান্তবিষয়ক বৈঠকেও সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, যোগাযোগের চ্যানেল সক্রিয় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত সমাধানের দিকে এগোনোর বিষয়ে একাধিক সমঝোতা হয়েছিল।

নয়াদিল্লির বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ভারত ও চীনকে অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। তার বক্তব্যে উন্নয়ন ও সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

চীনের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ, বিমান চলাচল, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের সমাধানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।

মোদি তার বক্তব্যে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। ভারতও সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্তের প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ২০২৬ সালের আগস্টের বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনাতেও সীমান্ত প্রশ্নের একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়।

অর্থাৎ, সীমান্ত বিরোধের সমাধান এখনো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। বর্তমান কূটনীতির লক্ষ্য আপাতত বড় সংঘাত এড়ানো, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ সচল রাখা।

ভারত ও চীনের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য। রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা পুরোপুরি কমেনি। সাম্প্রতিক বছরেও চীন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আমদানি অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

ভারতের জন্য সমস্যা হলো বড় বাণিজ্য ঘাটতি। চীনের কাছ থেকে ভারতের আমদানি ব্যাপক হলেও ভারতের চীনে রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে নয়াদিল্লি একদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, অন্যদিকে বাজারে আরও ভারসাম্য ও ন্যায্য প্রবেশাধিকার চায়। এ কারণেই মোদি-জিনপিং আলোচনায় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই বৈঠকের আরেকটি বিশেষ দিক হলো ব্রিকস। ভারত ২০২৬ সালে সংগঠনটির সভাপতিত্ব করছে এবং সম্মেলনের পরবর্তী মেয়াদে চীন সভাপতির দায়িত্ব নেবে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা শুধু দ্বিপাক্ষিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ব্রিকস, জাতিসংঘ, জি২০ ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চেও সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চীন ব্রিকসকে আরও বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। ২০২৬ সালের সম্মেলনে শি জিনপিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ভারতের কাছেও ব্রিকস এমন একটি মঞ্চ, যেখানে পশ্চিমা শক্তির বাইরে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো সম্ভব।

ভারত-চীন সম্পর্ককে শুধু সীমান্ত বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা—সবকিছুই এই সমীকরণকে প্রভাবিত করছে।

তবে মোদি বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কোনো তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ককেও ভারত নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে চায়। অর্থাৎ, নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে।

মোদি-জিনপিং বৈঠক নিঃসন্দেহে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। তবে এটিকে এখনই ভারত-চীন সম্পর্কের সম্পূর্ণ ‘বরফ গলা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ সীমান্ত বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, বাণিজ্য ঘাটতি, বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। চীনের পাকিস্তান-সম্পর্ক এবং ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে।

তবে দুই দেশের বর্তমান অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সংঘাতের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার পথেই এগোতে চাইছে ভারত ও চীন।

সীমান্তে শান্তি বজায় রেখে যদি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো যায়, তাহলে এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাসের সূচনা হতে পারে। কিন্তু সেটি বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বৈঠকের পর নেওয়া বাস্তব পদক্ষেপ এবং সীমান্তে পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকে তার ওপর।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে