×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৬০০ দিল্লি-প্রশিক্ষিত আমলার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৫:৫১:৩৯
২৬০০ দিল্লি-প্রশিক্ষিত আমলার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি!

নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন এসেছে—এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আগের সরকারের সময় প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক কাজে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

এর পাশাপাশি ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ২,৬০০ কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকে বর্তমানে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, জেলা প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এসব কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও প্রশাসনিক কাঠামো রাতারাতি বদলে যায় না। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নতুন সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে কতটা প্রভাব ফেলছে—এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অভিযোগ রয়েছে, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদোন্নতি পেয়েছেন। বিপরীতে যোগ্য ও মেধাবী অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি। কেবল অতীতের কোনো সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে বর্তমান সরকারের বিরোধী বা কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাবাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ২,৬০০ কর্মকর্তাকে ঘিরে সরকারের নজরদারির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাদের একটি অংশ বর্তমানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তবে বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া নিজেই কোনো কর্মকর্তার আনুগত্য বা রাজনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন।

এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোনো কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন, প্রশাসনিক বিধি ও সরকারের বৈধ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করছেন কি না এবং তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে বাধা দেওয়ার প্রমাণ আছে কি না।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেউ প্রশাসনের ভেতরে থেকে সরকারের কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দিচ্ছেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে ‘সাবোটাজ’ একটি গুরুতর অভিযোগ। কোনো কর্মকর্তা সরকারের কাজে বাধা দিচ্ছেন—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট ঘটনা, নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকার প্রমাণ প্রয়োজন। কেবল সন্দেহ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এমন অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

প্রশাসনিক সংস্কারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন। রাজনৈতিক বিবেচনায় কেউ পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকলে তা পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠতেই পারে।

কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও যেন নতুন কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়—এটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে।

প্রশাসনের ভেতরে থাকা পুরনো প্রভাব বলয়ের সঙ্গে ভারতের একটি ‘অদৃশ্য প্রভাব’-এর সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে এখানে অভিযোগ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং প্রমাণিত তথ্য—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা অতীতে নির্দিষ্ট সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন—এ দুটি তথ্য থেকে সরাসরি তার ওপর ভারতের প্রভাব রয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বরং প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, প্রশাসনিক যোগাযোগ, নীতিগত অবস্থান এবং আইনবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।

ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রশাসনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে সম্ভাব্য অনিয়ম বা স্বার্থের সংঘাত থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করাও জরুরি।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন শুধু ‘কারা আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন’ বা ‘কারা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন’—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধভাবে কাজ করছে।

ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক কাঠামো কতটা সংস্কার করা সম্ভব হবে এবং পুরনো প্রভাবের অভিযোগ কতটা বাস্তব প্রমাণে পরিণত হয়—তা সময়ের সঙ্গে আরও পরিষ্কার হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে