×
ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ বছরে ৬ এমডি, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৭:৫২:৩৪
৫ বছরে ৬ এমডি, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের সংকট থেকে এখনো বের হতে পারছে না ন্যাশনাল ব্যাংক। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিলেও পরিচালনাগত দুর্বলতা, ঘন ঘন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পরিবর্তন, বিপুল খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকটির সংকট আরও গভীর করেছে।

শাখায় শাখায় নগদ অর্থের সংকটে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। অনেক সময় এটিএম বুথেও প্রয়োজনীয় টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল করপোরেট সুশাসন ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ফলে মূলধন ও তারল্য—দুই ক্ষেত্রেই ব্যাংকটি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে।

এদিকে ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

তারল্য সংকট সামাল দিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৯০ দিনের জন্য ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ডিমান্ড প্রমিসরি (ডিপি) নোটের বিপরীতে ১ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে ব্যাংকটি চাপের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকটির আবেদন অনুমোদন করা হয়।

ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ বেড়েছিল। একই সময়ে আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে নিজস্ব উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তারল্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়েছে।ব্যাংকটির পক্ষ থেকে কৃষিঋণ বাদে আরও তারল্য সহায়তার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকার বেশি অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এটিএম বুথ থেকেও নিয়মিত টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।

গুলশান করপোরেট শাখার একজন গ্রাহক জানান, চাকরির সুবাদে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ওই শাখায় বেতন হিসাব পরিচালনা করছেন। বেতন জমা হওয়ার পরও অনেক সময় এটিএম বুথে ডেবিট কার্ড দিয়ে টাকা তুলতে পারেননি।

তার ভাষ্য, কখনো অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা তোলা গেলেও সেটিও নিয়মিত সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ না পেয়ে বাধ্য হয়ে সুপারশপে কার্ড ব্যবহার করে বেতনের টাকা খরচ করতে হয়েছে।

আরেক গ্রাহক হোসাইন সাজ্জাদ জানান, সম্প্রতি ১৫ হাজার টাকার একটি চেক নগদায়নের জন্য গুলশান শাখায় গিয়ে তাকে দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে দীর্ঘ বাকবিতণ্ডার পর তিনি টাকা তুলতে সক্ষম হন।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শুধু নতুন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা কার্যকর সমাধান নয়। আগে এসব ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, পরিচালনা পর্ষদকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দূর করতে হবে। বর্তমানে অনেক দুর্বল ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে তারা যথাযথ আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

তার মতে, কোনো ব্যাংককে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগে কার্যকর সংস্কার, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাও জরুরি।

ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ছিল। ২০০৮ সালের পর জয়নুল হক শিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ব্যাংকটিতে অনিয়ম, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। পরে পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে যায়।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়, ন্যাশনাল ব্যাংক ছিল তাদের অন্যতম। তবে পর্ষদে পরিবর্তন এলেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ, কার্যকর করপোরেট সুশাসন এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার—এই চারটি ক্ষেত্রেই একযোগে অগ্রগতি প্রয়োজন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ঘন ঘন পরিবর্তন। গত পাঁচ বছরে ভারপ্রাপ্তসহ ছয়জন এমডি পদত্যাগ করেছেন, বাধ্যতামূলক ছুটিতে গেছেন অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল হক শিকদারের মৃত্যুর পর পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণ এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে এমডির দায়িত্ব পরিচালনার ঘটনায় ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে এ এস এম বুলবুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল শাহ সৈয়দ আবদুল বারী এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মেহমুদ হোসেন এমডি হিসেবে যোগ দেন। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি আবারও এমডির দায়িত্বে ফেরেন।

এদিকে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংক মো. তৌহিদুল আলম খানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা তৌহিদুল আলম খানও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।

বর্তমান এমডি আদিল চৌধুরী ২০২৫ সালের ৭ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইতোমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্বে থাকা ইমরান আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও ‘দেউলিয়া’ শব্দটি ব্যবহারের ফলে ব্যাংকটি আরও চাপে পড়ে।তিনি বলেন, “তাদের এই বক্তব্য আমাদের সিগনিফিক্যান্টলি শ্যাটার করেছে।”

ইমরান আহমেদ বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম বড় ব্যাংক। একপর্যায়ে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের তারল্য সংকট তৈরি হলেও আমানতকারীদের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নীতিগত সহায়তায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।

তার ভাষ্য, “একটা ব্যাংকের প্রাণ হচ্ছে আমানত। আমানতকারীদের সহায়তায় আমরা আস্তে আস্তে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছি। বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পর্যায় থেকেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছি।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, ব্যাংকটির আমানত পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গ্রাহকদের আস্থা আগের তুলনায় বাড়লেও দৈনিক যে পরিমাণ আমানত আসার কথা, সে অনুযায়ী আমানত আসছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্রসঙ্গে ইমরান আহমেদ বলেন, প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকের জন্য এই অর্থ খুব বড় কোনো বিষয় নয়। মূলত আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করতেই এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।

তবে সহায়তার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাংকটিতে টাকা উত্তোলনের চাপ আরও বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি। তার মতে, এ ধরনের তহবিল অনেক সময় ব্যাংকের জন্য ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক চাপই বাড়িয়ে দেয়।

তিনি জানান, বর্তমানে তারল্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ‘রেশনিং’ করতে হচ্ছে। তবে ছোট অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।বড় অঙ্কের টাকা একসঙ্গে উত্তোলনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য, “আমরা গ্রাহকদের টাকা তুলতে দিচ্ছি না—এটা ঠিক নয়। তবে তারা যেভাবে চাইছেন, একবারে সব টাকা তুলে নিতে পারছেন না। বড় অঙ্ক পরামর্শ দিয়েছে। ওইের টাকা হলে আমাদের একটি পরিকল্পনার মধ্যে যেতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১ লাখ টাকার মতো তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা নেই। তবে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার কর্মীদের বেতন এবং বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধের সময় তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংকই শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংককে খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে জোর দিতে হবে। তাহলেই আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল ২৯টি ব্যাংককে নতুন করে তারল্য সহায়তা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ওই তালিকায় একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের নামও রয়েছে।

এ ছাড়া জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও এবি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এসব ব্যাংকে নতুন আমানত সংগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ফলে ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধু সাময়িক তারল্য সহায়তা নয়, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে