×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ, জানালেন বিশেষজ্ঞ

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১৯:১১:৪২
প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ, জানালেন বিশেষজ্ঞ

ডা. রাফিয়াতুর রাফা: প্রোটিন ও নানা পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ডিম। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—প্রায় সব বয়সী মানুষের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা। তবে ডিম খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে যেমন আলোচনা রয়েছে, তেমনি এটি ঘিরে আছে নানা প্রশ্ন ও প্রচলিত ধারণা। প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত, কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায় কি না, কাঁচা ডিম খাওয়া নিরাপদ কি না—এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমার।

ডিমে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন

ডা. অরুণ কুমারের মতে, একটি ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালরি শক্তি ও ৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া যায়। শরীর সহজেই এ প্রোটিন শোষণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারে বলে একে উন্নতমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খাদ্যের প্রোটিনের গুণমান মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও ডিমের প্রোটিনকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে পুষ্টিবিজ্ঞানে একে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা উৎকৃষ্ট মানের প্রোটিনের আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ডিমের কুসুম কি বাদ দেওয়া উচিত?

অনেকেই মনে করেন, ডিমের সাদা অংশ পুষ্টিকর হলেও কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবে ডা. অরুণ কুমারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিষয়টি এত সরল নয়। ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমেও প্রোটিন রয়েছে। একই সঙ্গে কুসুমে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান আছে, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

কুসুমে থাকা কোলিন স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের পাশাপাশি গর্ভের শিশুর সঠিক বিকাশেও এই পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

ডিম থেকে ভিটামিন ডি, ফোলেট, আয়োডিন এবং বিভিন্ন বি ভিটামিনও পাওয়া যায়। ফলে শুধু কুসুমে কোলেস্টেরল থাকার কারণে পুরো ডিমকে পুষ্টিহীন বা ক্ষতিকর মনে করা ঠিক নয়।

দিনে কতটি ডিম খাওয়া যেতে পারে?

একজন মানুষের প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত, তা তাঁর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদার ওপর নির্ভর করে। ডা. অরুণ কুমারের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের প্রতিদিন এক থেকে দুটি ডিম দেওয়া যেতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুটি ডিম খাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

বয়স্ক ব্যক্তিরাও দৈনিক প্রায় দুটি ডিম খেতে পারেন। অন্যদিকে, নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং যাঁদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি, তাঁরা দিনে তিন থেকে চারটি ডিম খেতে পারেন বলে তাঁর মত। সাধারণভাবে অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রতিদিন এক থেকে দুটি ডিম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এসব পরামর্শে কুসুমসহ পুরো ডিমের কথাই বলা হয়েছে।

তবে ব্যক্তিভেদে পুষ্টির চাহিদা আলাদা হতে পারে। বিশেষ কোনো রোগ বা খাদ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ থাকলে চিকিৎসক কিংবা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

কুসুমের কোলেস্টেরল কি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়?

ডিম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয় এর কুসুমে থাকা কোলেস্টেরলকে কেন্দ্র করে। একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে। কিন্তু খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল একই বিষয় নয়।

ডা. অরুণ কুমার বলেন, শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বড় একটি অংশ যকৃত নিজেই তৈরি করে। খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ বেড়ে গেলে যকৃত অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব উৎপাদন কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দিনে দুটি ডিম খেলে খাবার থেকে প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শরীর যকৃতে কোলেস্টেরল উৎপাদনের পরিমাণ কমাতে পারে। তবে ডিম ছাড়াও দুধ, দুগ্ধজাত খাবার ও মাংসের মতো বিভিন্ন খাবারে কোলেস্টেরল রয়েছে।

অন্যদিকে, রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এলডিএল ধমনির দেয়ালে প্লাক জমাতে ভূমিকা রাখে। এতে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞের মতে, খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল সাধারণভাবে সবার রক্তের কোলেস্টেরল একই মাত্রায় বাড়ায় না। তাই শুধু ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল রয়েছে—এ কারণে সবার জন্য ডিম বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

যাঁদের ডিমের কুসুম খাওয়ায় সতর্কতা প্রয়োজন

ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া একটি বিরল বংশগত রোগ। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে কোলেস্টেরল প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে রক্তে এলডিএলের মাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিমের কুসুম কমানো বা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতে পারেন। তাই রোগটি থাকলে নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

ডা. অরুণ কুমারের মতে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষ পরিমিত পরিমাণে ডিমের কুসুম খেতে পারেন। কুসুম খেলে জন্ডিস হয় কিংবা কিডনির ক্ষতি হয়—এমন প্রচলিত ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

দেশি ডিম ও খামারের ডিমের পুষ্টিগুণে কতটা পার্থক্য?

ডিম কেনার সময় অনেকেই দেশি বা উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগির ডিমকে খামারে উৎপাদিত ডিমের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞের মতে, দুই ধরনের ডিমেই প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ মোটামুটি কাছাকাছি হতে পারে।

উন্মুক্ত পরিবেশে থাকা মুরগি ঘাস, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাবার খেলে তাদের ডিমে ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে। এ কারণে কুসুমের রং গাঢ় হলুদ কিংবা কমলা দেখাতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণও সামান্য বেশি থাকতে পারে।

তবে এ পার্থক্য খুব বেশি নয়। ডিম খাওয়ার মূল উদ্দেশ্য যদি প্রোটিন ও সাধারণ পুষ্টি পাওয়া হয়, তাহলে খামারে উৎপাদিত ডিমও উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে। শুধু পুষ্টির জন্য কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগির ডিম কেনার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার।

মুরগিকে কি দ্রুত বড় করতে হরমোন দেওয়া হয়?

ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে প্রচলিত। কিন্তু ডা. অরুণ কুমারের মতে, এ ধারণা সঠিক নয়। মুরগি পালনে হরমোন ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয়; পাশাপাশি এ ধরনের ব্যবস্থার খরচও অত্যন্ত বেশি।

মুরগির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়া হয়। অনেক সময় টিকা দেওয়ার বিষয়টিকেই ভুল করে হরমোন প্রয়োগ বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া ডিম বা মুরগির মাংস খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি অস্বাভাবিকভাবে আগেই শুরু হয়—এমন দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ডিম খেলে কি গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি হয়?

কিছু মানুষের ধারণা, ডিম খেলে গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি তৈরি হয়। তবে এ সমস্যা সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। ডিমের কুসুম খাওয়ার পর কারও কারও সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে। নিয়মিত ডিম খাওয়ার সঙ্গে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা কমে আসতে পারে।

তবে ডিম খাওয়ার পর নিয়মিত পেটব্যথা, অস্বস্তি বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কাঁচা ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ?

কাঁচা ডিম খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, কাঁচা ডিমে সালমোনেলা নামের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পেটের সমস্যা হতে পারে; কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতরও হতে পারে।

এ ছাড়া কাঁচা ডিমের সাদা অংশে থাকা অ্যাভিডিন নামের প্রোটিন বায়োটিন শোষণে বাধা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কাঁচা ডিম খেলে এ কারণে শরীরে বায়োটিনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কাঁচা ডিমের পরিবর্তে ভালোভাবে রান্না করা ডিম খাওয়াই নিরাপদ।

ডা. অরুণ কুমারের মতে, সেদ্ধ, হাফ বয়েল কিংবা ভাজা—ডিম রান্নার এসব পদ্ধতির মধ্যে পুষ্টিগুণের বড় কোনো পার্থক্য নেই। তবে ডিম নিরাপদভাবে রান্না করা গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও নিজেদের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে ডিম রাখতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ডিমকে ঘিরে প্রচলিত অনেক ধারণার পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডিম প্রোটিন ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্য উৎস হলেও কতটা খাওয়া উচিত, তা ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। সঠিকভাবে রান্না করা এবং পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়ার মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ গ্রহণ করা সম্ভব। সূত্র: বিবিসি বাংলা

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

লাইফ স্টাইল এর সর্বশেষ খবর

লাইফ স্টাইল - এর সব খবর

উ
প
রে