×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকার, অভ্যন্তরীণ সংকটের শঙ্কা

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১৮:৫৯:৫৯
সরকারি ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকার, অভ্যন্তরীণ সংকটের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারের নতুন নীতিমালার আলোকে বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পথ সুগম হচ্ছে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ব্যাংকপাড়ায়। সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, বাইরে থেকে এসে শীর্ষ পদে বসালে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁদের স্বাভাবিক পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ অক্টোবর, যখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি, ডিএমডি এবং জিএম পদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত ২০২৬ সালের নীতিমালা রহিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রক্রিয়াটিকে যুগোপযোগী করার অজুহাতে নতুন নীতিমালার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, সংশ্লিষ্টদের মতে—বেসরকারি ব্যাংকারদের সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর পথ তৈরি করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে সাউথইস্ট ব্যাংকের এএমডি মাহবুব আলম এবং বিডিবিএল-এর এমডি পদে যমুনা ব্যাংকের ডিএমডি নুর মোহাম্মদের নাম নিয়ে জোর আলোচনা চলছে, যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

সরকারের যুক্তি ও কর্মকর্তাদের আপত্তি

সরকার পক্ষের মতে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের সরকারি ব্যাংকের দায়িত্ব দিলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি কমবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই যুক্তি মানতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিএমডি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সারা জীবন ব্যাংককে সেবা দিয়ে শেষ বয়সে এমডি হওয়ার একটা স্বাভাবিক আশা থাকে। সেই পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতি বা খেলাপির পেছনে এককভাবে এমডি দায়ী নন; এর পেছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পরিচালনা পর্ষদের অন্যায্য সিদ্ধান্তই প্রধান কারণ।"

কর্মকর্তারা আরেকটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছেন বেতনকাঠামো নিয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের একজন ডিএমডি যেখানে ৭-৮ লাখ টাকা বেতন পান, সেখানে সরকারি ব্যাংকের এমডি পদের বেতন মাত্র ৫-৬ লাখ টাকা। তুলনামূলক কম বেতনের পদে আসতে তাদের এই অতিরিক্ত আগ্রহের নেপথ্যে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাকি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও শঙ্কা

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও 'পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চ'-এর চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কর্মপদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাইরের খাত থেকে বা অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এমডি বানিয়ে আনলে নেতৃত্বে ফাটল ধরবে এবং বিশেষ কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঝুঁকি তৈরি হবে।

অন্য এক অর্থনীতি বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ খান জনির মতে, সরকার যদি মনে করে যোগ্য কর্মকর্তার অভাব আছে, তবে এতদিন কাদের রাজনৈতিক বা অন্যায্য বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে—সেই প্রশ্ন জাগে। বর্তমানে ডিএমডি বা জিএম পদে চার বছর পার করা অভিজ্ঞদের মধ্য থেকেই যোগ্য এমডি নির্বাচন করা সম্ভব। বাইরে থেকে লোক আনলে সার্বিক ব্যাংক খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার অবমূল্যায়নের অনুভূতি তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ও কাজের স্পৃহা ধ্বংস হয়ে যাবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির দোহাই দিয়ে সরকারি ব্যাংকের প্রশাসনিক বাস্তবতার বাইরে থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়ে আসাটা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি ব্যাংকিং খাতে নতুন বিশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি করতে পারে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে