×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে আগুন, বিপদে বাংলাদেশ

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৯:১৩:৩৫
ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে আগুন, বিপদে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যেখানে চাহিদার ৯৫ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, সেখানে আজ দেশের মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। ১৬০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তবে এই আত্মনির্ভরতার গর্বের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর ভঙ্গুরতা। সম্প্রতি গাজীপুরের দুটি শীর্ষ ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেশের ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, কাঁচামাল সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গাজীপুরে জোড়া অগ্নিকাণ্ড: ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ও ইবনে সিনা

এক সপ্তাহের ব্যবধানে গাজীপুরের দুটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে:

১. ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল (টঙ্গী): গত ১৪ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর চেরাগআলীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (ইউনিট-২) কারখানার তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট, সেনাবাহিনী ও বিজিবির যৌথ প্রচেষ্টায় প্রায় চার ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তা পুরোপুরি নেভাতে সময় লাগে ১২ ঘণ্টার বেশি। এতে ফায়ার সার্ভিসের ৩ কর্মী আহত হন। ঘটনার পর কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

২. ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস (কালিয়াকৈর): এর মাত্র তিন দিন পর, ১৭ অক্টোবর বিকেলে কালিয়াকৈরের সফিপুরে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ছয়তলা ভবনের নিচতলার গুদামে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের চেষ্টায় এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ওষুধ শিল্পের সাফল্যের পরিসংখ্যান

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) তথ্য অনুযায়ী:

বর্তমানে দেশে ২৯৫টি অনুমোদিত অ্যালোপ্যাথিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৪৬ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদন করে।

২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধ বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকায়, যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২.৪৩ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি আয় হয়েছে ২১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার (পূর্ববর্তী বছরে যা ছিল ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার)।

দেশের বাজারের প্রায় ৩৯.৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান—স্কয়ার, ইনসেপ্টা ও বেক্সিমকো।

আসল দুর্বলতা: কাঁচামাল বা এপিআই (API)-এর পরনির্ভরশীলতা

কারখানায় আগুন লাগার চেয়েও গভীর সংকট হলো ওষুধের সক্রিয় উপাদান বা অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই)-এর চরম পরনির্ভরশীলতা।

প্রয়োজনীয় প্রায় ৪০০ ধরনের এপিআই-এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র ৪১টি।

দেশীয় ওষুধ শিল্পের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাঁচামালই আমদানি করতে হয় চীন ও ভারত থেকে।

প্রতি বছর এপিআই আমদানিতে ব্যয় হয় প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার।

এর আগে ঢাকার বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৪২ ধরনের কাঁচামাল পুড়ে গিয়ে ১৮৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল (যার মধ্যে হেলথকেয়ার, বেক্সিমকো, অপসোনিন ও ইউনিমেড-ইউনিহেলথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়)। এ থেকে স্পষ্ট, সরবরাহ চেইনের একটি জায়গায় বিঘ্ন ঘটলেই গোটা শিল্প মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।

অগ্নি-নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সংকট

অগ্নিঝুঁকির উপাদান: অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, রাবার ব্লক ও দাহ্য রাসায়নিক থাকায় ওষুধ কারখানায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টঙ্গীর কারখানায় নিজস্ব পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে যাওয়ায় দূর থেকে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়েছিল।

নিরাপত্তা নিরীক্ষার অভাব: মিরপুরের পোশাক ও রাসায়নিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহতের ঘটনার পরও দেশের কারখানাগুলোতে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা (যেমন—স্প্রিংকলার, হাইড্রেন্ট) কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা গেছে।

ব্যবস্থাপনাগত অস্থিরতা: সম্প্রতি বেক্সিমকো ফার্মায় পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং শিল্প পার্কে বেশ কিছু ইউনিট বন্ধ হয়ে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিকের কর্মহীন হওয়ার খবরও শিল্পের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতাকে নির্দেশ করে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সামনে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে, যার ফলে ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির আওতায় ওষুধের পেটেন্ট ছাড়ের সুবিধাও সংকুচিত হবে। এমন বাস্তবতায় বিশ্লেষকরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন:

১. নিরপেক্ষ তদন্ত: গাজীপুরের দুটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

২. নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার: পর্যাপ্ত পানির মজুত, স্প্রিংকলার ও হাইড্রেন্ট ব্যবস্থার নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া ও তদারকি নিশ্চিত করা।

৩. এপিআই পার্ক কার্যকর করা: মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার এপিআই শিল্প পার্ককে দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা, যাতে দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং আমদানি নির্ভরতা কমে।

৪. আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ: একক বা দুটি দেশের ওপর নির্ভর না করে কাঁচামাল আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি রাখা।

ওষুধ শিল্পের সাফল্য কেবল রপ্তানি আয় বা কোটি টাকার বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একজন মুমূর্ষু রোগী যেন সময়মতো তাঁর প্রেসক্রিপশনের ওষুধটি ন্যায্যমূল্যে পেতে পারেন। দুটি কারখানায় আগুন নিভে গেলেও তা দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য যে বিপদের সতর্কবার্তা রেখে গেছে, তা আমলে নিয়ে কার্যকর অবকাঠামোগত সংস্কার না করলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবাই হুমকির মুখে পড়বে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে