×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

পাকিস্তানকে কাছে টানছে যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্পের চালে কাঁপছে দিল্লি

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৯:২০:০৭
পাকিস্তানকে কাছে টানছে যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্পের চালে কাঁপছে দিল্লি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের সমীকরণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একদিকে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নয়াদিল্লির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান কিংবা বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ক্ষতির বিনিময়ে গড়ে উঠবে না। তাঁর বক্তব্য, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দুই দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এই অংশীদারত্বকে দুর্বল করা হবে না।

রুবিও ১৯৭০-এর দশকের নিক্সন-কিসিঞ্জার আমলের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করতেও আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সে সময়ের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তাই অতীতের স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপট দিয়ে বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে বিচার করা যথাযথ হবে না।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বৈঠক হয়। এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হতে পারে। রুবিওর বক্তব্যেও সেই কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিস্থিতিতে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পেতে পারে, যা ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে ভারতের উদ্বেগের জায়গা হলো, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের নীতি কতটা ধারাবাহিক থাকবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ রয়েছে।

পাকিস্তান ইস্যুর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কে বাণিজ্য, শুল্কনীতি, জ্বালানি এবং অভিবাসননীতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রুবিও স্বীকার করেছেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য, এসব জটিলতা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে।

প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ওয়াশিংটন আগ্রহী। একই সঙ্গে ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যোগাযোগ বাড়লেও তা সরাসরি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারত্বের অবসান বা ভাঙনের ইঙ্গিত দেয় না।

বরং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর মুম্বাইয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন—এমন দাবি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এই দাবিকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্কো রুবিওর সফরসূচিতে মুম্বাইয়ে ব্যবসায়িক বৈঠক ও বিভিন্ন যোগাযোগের বিষয় ছিল। কোনো বৈঠক মুম্বাইয়ে নির্ধারিত হওয়া এবং একজন বিদেশি কূটনীতিকের নির্দেশে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সেখানে যেতে বাধ্য করার দাবি—দুটি আলাদা বিষয়।

তাই এ ঘটনাকে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বা মোদি সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বাণিজ্যিক সমঝোতা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মতো একাধিক বিষয়ের ওপর। পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও, দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অন্যান্য ক্ষেত্রও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশগুলোর সম্পর্ক সাধারণত স্থায়ী বন্ধুত্বের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রয়োজনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থানও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। ফলে ভারতের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও কীভাবে পাকিস্তান-সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করা এবং নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী রাখা যায়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে