×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

টিকিট মিলছে না যাত্রীদের, রেলওয়ের ভেতরে কী চলছে?

২০২৬ অক্টোবর ২০ ২১:৪১:৪০
টিকিট মিলছে না যাত্রীদের, রেলওয়ের ভেতরে কী চলছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনলাইনে ট্রেনের টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়া, বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করা এবং কালোবাজারির অভিযোগের মধ্যে টিকেটিং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী নভেম্বর মাসে নতুন এজেন্সি নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরই মধ্যে টিকিট ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সংস্থাটি।

রেলওয়ের টিকেটিং সিস্টেম নিয়ে পরিচালিত আইটি অডিটে একাধিক অনিয়ম ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে। অডিট অনুযায়ী, সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত করার কয়েক দিন আগেই অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সেগুলো ব্লক করার সুযোগ ছিল। সহজের প্রতিনিধি ও রেলওয়ের বুকিং সহকারীরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অডিটে সহজের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্টের অপব্যবহারে টিকিট আটকে রেখে কালোবাজারির সুযোগ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সমন্বিত টিকেটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) নিয়ে করা অডিটে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে টিকিট বিক্রির আয়ের তুলনায় সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়নি।

গত ১৬ আগস্ট পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে আইটি অডিট দলের উত্থাপিত ২২টি অডিট মেমো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ‘bookmyrailbd.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলসংখ্যক টিকিট ব্লক করা হতো। পরে সেগুলো অননুমোদিত ওয়েবসাইটে বাড়তি দামে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা ন্যায্যমূল্যে টিকিট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বিআরআইটিএস পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি। চুক্তির কারিগরি শর্তে ই-টিকেটিং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগ ব্যবস্থাটির নিরাপত্তা ও চুক্তির শর্ত পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি

অডিট প্রতিবেদনে বিআরআইটিএসের মূল ডেটাবেইসের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে। ডেটাবেইসটি আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলে ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি হ্যাক হলে যাত্রীদের নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ভ্রমণের ইতিহাস ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চুরি হতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

টিকিট ব্লক করার সুযোগ, অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের ব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়গুলো টিকেটিং ব্যবস্থায় নজরদারি ও আর্থিক জবাবদিহি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

টিকিট না পেয়ে দুর্ভোগে যাত্রীরা

অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পরপরই তা শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে টিকিট না পেয়ে অনেককে বিকল্প পরিবহন বেছে নিতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে বেশি দামে টিকিট কিনছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের নিয়মিত যাত্রী নুরুদ্দীন তাসলিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত পাঁচ বছরে দু-একবার ছাড়া বেশির ভাগ সময়ই রেলের ওয়েবসাইটে টিকিট পাননি। পরে বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে বেশি দামে টিকিট কিনতে হয়েছে। সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও কালোবাজারিরা টিকিট সংগ্রহ করতে পারছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, শুধু ঈদে নয়, অন্য সময়েও অন্তত ১০ দিন আগে টিকিট না কাটলে পাওয়া কঠিন। জরুরি প্রয়োজনে দুই দিন আগে বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও টিকিট মেলে না। গত পাঁচ থেকে দশ বছরে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি, বরং বেড়েছে।

এক মিনিটেই শেষ দুই ট্রেনের টিকিট!

গত ৭ অক্টোবর চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে টিকিট না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, মামার শারীরিক সমস্যার কারণে বাসে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ সম্ভব না হওয়ায় সেজো মামা, মামী ও মামাতো বোনকে নিয়ে পূজার ছুটিতে কক্সবাজার যেতে ট্রেনের টিকিট কাটার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তিনি সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকেই টিকিট কাটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। সকাল ৮টায় ‘সার্চ ট্রেন’ অপশনে চাপ দেওয়ার পর সিট প্ল্যান দেখা গেলেও মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। অথচ তাঁর অভিজ্ঞতায় টিকিট নির্বাচন, ওটিপি, পেমেন্ট ও নিশ্চিতকরণ শেষ করতে কমপক্ষে সাড়ে ছয় থেকে সাত মিনিট লাগে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট কীভাবে শেষ হলো, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

আশফাক নিপুণের মতে, ঈদ-পূজার মতো ছুটিতে টিকিট কাটতে গিয়ে বারবার একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। দীর্ঘদিনের টিকিট সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, সফটওয়্যার পরিবর্তন করলেই এ প্রভাব দূর হবে কি না। সরকার ও মন্ত্রণালয় বদলালেও সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে টিকিট না পাওয়া নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। তবে টিকিট সংকটের প্রকৃত কারণ ও এর পেছনে কারা দায়ী, তা শনাক্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

নতুন এজেন্সি নিয়োগের মাধ্যমে টিকিটের সহজলভ্যতা বাড়ানো, কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের তথ্য সুরক্ষা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা ও নিয়মিত তদারকির ওপর।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে