×
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নোমান গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ-বিতর্ক, এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১১:০৫:২০
নোমান গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ-বিতর্ক, এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী নোমান গ্রুপ দাবি করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে বিদেশি ক্রেতা ও ব্যাংকগুলোকে বিভ্রান্ত করছে। এর ফলে কয়েকটি ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে এবং কিছু ব্যাংক ঋণ ও এলসি সীমা কমিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ঘটনায় নোমান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

চিঠিতে নোমান গ্রুপ অভিযোগ করেছে, কাজল সরকার, হারুন অর রশিদ (বডি বিল্ডার হারুন), আনোয়ার হোসেন, হেলাল উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন ব্যক্তি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, তফসিলি ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), তিতাস গ্যাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ কার্যালয়ে বিভিন্ন অভিযোগ দিচ্ছেন।

নোমান গ্রুপের দাবি, এসব অভিযোগের প্রভাবে ওয়ালমার্ট, আইকিয়া, এইচঅ্যান্ডএম, কে-মার্ট, টার্গেট ও লিডলের মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কিছু ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। আরও বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ নিয়েও ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তির অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে যেন ব্যাংকগুলো ঋণ বা এলসি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়, সে বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

তার দাবি, অভিযোগের পর কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির এলসি সীমা কমিয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার এলসি সীমা কমিয়ে ৫০ কোটি টাকা করেছে বলেও তিনি জানান।

নুরুল ইসলামের ভাষ্য, এ ধরনের সিদ্ধান্তে ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং গ্রুপটির ৮০ হাজারের বেশি কর্মী ও শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

নোমান গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে হারুন অর রশিদ ও তার ভাই আনোয়ার হোসেনকে ওয়েস্টেজ ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ব্যবসার মূলধনের ঘাটতি থাকায় গ্রুপের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে হারুনকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৯৩ লাখ টাকা ধার দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

২০২০ সালের নভেম্বরে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত বলে জানিয়েছে নোমান গ্রুপ।

প্রতিষ্ঠানটির চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর হারুনকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয় বলে নোমান গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন এবং কাজল সরকার গাজীপুরে দেওয়ানি মামলা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারায় মামলা করেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০৭ ধারার মামলাটি সম্প্রতি নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করেছে নোমান গ্রুপ।নোমান গ্রুপের অভিযোগের বিষয়ে কাজল সরকার ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, নোমান গ্রুপের সঙ্গে তার মূল বিরোধ জমি নিয়ে।

তার দাবি, গাজীপুরের টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় প্রায় ৭০ বিঘা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান। মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই জমি ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জানানো তার দায়িত্ব বলে দাবি করেন তিনি।

কাজল সরকার আরও জানান, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। গ্যাস চুরির অভিযোগও করেছিলেন বলে জানান তিনি। তবে তদন্তে অভিযোগটির সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে তাকে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন কাজল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেয় না।

তিনি জানান, ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। ঋণগ্রহীতার প্রকৃত সম্পদ, আর্থিক সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করেই ব্যাংক ঋণ ও এলসির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

নোমান গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা করছে এবং বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গ্রুপটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এতে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড একাধিকবার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (গোল্ড) অর্জন করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে নোমান গ্রুপ ও কাজল সরকারের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সত্যতা এবং এর ব্যবসায়িক প্রভাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্তভাবে বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে।

কেএইচ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে