×
ঢাকা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন: বৈঠকে নবগঠিত মজুরি বোর্ড

২০২৬ নভেম্বর ০৪ ১৭:১২:৪৪
৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন: বৈঠকে নবগঠিত মজুরি বোর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা আন্দোলনের মধ্যেই তৈরি পোশাক খাতের নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার গঠিত মজুরি বোর্ড। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বুধবার (৪ নভেম্বর) এই গুরুত্বপূর্ণ প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, আলোচনার টেবিল তৈরির পাশাপাশি রাজপথের উত্তাপও কমেনি; আন্দোলনের পঞ্চম দিনেও ঢাকার আশপাশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনের মুখে শত শত কারখানায় উৎপাদন থমকে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক রপ্তানি চালান পাঠানো নিয়ে গভীর উদ্বেগে পড়েছেন পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের ১৪০ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর দাবি

বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের নির্ধারিত ন্যূনতম বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে খাদ্যদ্রব্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। ফলে বিদ্যমান বেতন কাঠামো থেকে একলাফে প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করে তা ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।

শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ ও সাউন্ড গ্রেনেড, উৎপাদন স্থগিত অনেক কারখানায়

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বুধবার ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ও পুলিশ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সংযোগ সড়ক ও মহাসড়ক অবরুদ্ধ করলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। নতুন করে সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক মালিক তাদের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হন।

মজুরি বোর্ডের রূপরেখা ও দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ

ক্রমবর্ধমান শ্রমিক ক্ষোভ প্রশমিত করতে সরকার ছয় সদস্যের একটি সমন্বিত মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এতে মালিক ও শ্রমিকদের নির্ধারিত প্রতিনিধির পাশাপাশি একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রয়েছেন। এই বোর্ডের মূল দায়িত্ব তৈরি পোশাক খাতের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে একটি যৌক্তিক ও নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা। তবে শ্রমিক নেতাদের দাবি, কেবল কাগুজে পর্যালোচনা বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বর্তমান বাজারদর ও পরিবারের নূন্যতম জীবনযাত্রার মান বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও বোর্ডে শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য বাবুল আখতার উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের পারিশ্রমিক এখনো অন্যতম সর্বনিম্ন। তিনি মনে করেন, কারখানা মালিকেরা যদি শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিতে ব্যর্থ হন, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে তৈরি পোশাকের বিক্রয়মূল্য বা পণ্যের ন্যায্য দাম নিয়ে তাদের নতুন করে দরকষাকষি করা উচিত।

জাতীয় অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবস্থান মেরুদণ্ডের মতো। এই একটি শিল্পেই সরাসরি কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। দেশের মোট জিডিপিতে ১০ শতাংশ অবদান রাখা এই খাত থেকেই আসে মোট জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। চীনের পরেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান করছে।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন—এইচঅ্যান্ডএম (H&M), ইন্ডিটেক্সের জারা (Zara) ও ওয়ালমার্ট (Walmart)-এর মতো পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশ থেকেই তাদের বেশিরভাগ পণ্য সরবরাহ করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের মূল উৎপাদন চলাকালে এই দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে মারাত্মক আঘাত হানতে পারে বলে বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা পুরো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তবে সুইডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, কিছু কারখানা সাময়িক বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি, যদিও এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।

মালিকপক্ষের উদ্বেগ ও বৈশ্বিক বাজারের চাপ

অপরদিকে, কারখানা মালিকেরা তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট এবং প্রধান কিছু রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে তারা এমনিতেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানার উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে অস্বাভাবিক মজুরি বৃদ্ধি করা হলে অনেক কারখানার পক্ষে সেই আর্থিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এর আগে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আন্দোলনরত শ্রমিকদের শান্ত হয়ে মজুরি বোর্ডকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে এ-ও স্পষ্ট করেন যে, বেআইনি আন্দোলন ও কাজ বন্ধ রাখা অব্যাহত থাকলে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী কঠোর ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতি প্রয়োগ করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের যৌথ দায়িত্ব

পোশাক খাতের এই সংকট নিরসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে অতিরিক্ত মজুরি দেওয়ার পরও বৈশ্বিক বাজারে দেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন মূলস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাস্তব খরচ দেখতে হবে, তেমনি কারখানার অর্থ পরিশোধের সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

তিনি আরও মনে করেন, শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত বেতন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতা বা ব্রোকারদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। পণ্যের সঠিক মূল্য প্রদান ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় ন্যায্য পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রেতাদেরও এই শিল্প ও শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। অধ্যাপক সেলিম রায়হানের সতর্কবার্তা—সস্তা শ্রমকে চিরকাল প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও উচ্চমূল্যের ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরির দিকে বাংলাদেশকে মনযোগী হতে হবে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে