×
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

এআই নিয়ে নতুন শঙ্কা, শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দরপতন

২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১৭:০৭:২৭
এআই নিয়ে নতুন শঙ্কা, শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দরপতন

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। একদিনেই যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের আওতাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলার কমে গেছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর এআই খাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ বেড়েছে।

বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে অর্থ সরিয়ে সরকারি বন্ড ও অন্যান্য তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করছেন। এতে বিশ্ববাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ আরও তীব্র হয়েছে।

এদিন এশিয়ার বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতন হয়েছে জাপানে। দেশটির প্রধান শেয়ারসূচক নিক্কেই প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় পতন।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রধান শেয়ারসূচক লেনদেনের একপর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি কমে যায়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজারের পতন ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমে আসে।

তবে দিন শেষে তাইওয়ানের শেয়ারবাজার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পতন নিয়ে লেনদেন শেষ করে। পুরো সপ্তাহে সূচকটির পতন দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের পর এটি তাইওয়ানের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতন।

এআই খাতের শেয়ারে বিক্রির চাপের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে বাজারের আতঙ্ক পরিমাপক ভোলাটিলিটি ইনডেক্স বা ভিআইএক্সের উত্থান বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

একদিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের আওতাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি ডলার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বাজারের অস্থিরতার গভীরতা তুলে ধরেছে।

তবে পরবর্তী সময়ে নাসডাকের ফিউচার লেনদেনে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। সূচকটির ভবিষ্যৎ লেনদেন ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ইউরোপের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচক প্রায় ১ শতাংশ কম ছিল।এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ার একপর্যায়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দিন শেষে পতনের হার দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশে।

জাপানের মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারও প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে এআই খাতে বড় বিনিয়োগকারী সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ারের দাম ১১ শতাংশ পড়ে যায়।

সফটব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির বিপরীতে বিমা ব্যয়ও গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণনির্ভর বিনিয়োগ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং উন্নত চিপ উৎপাদনে বিপুল ব্যয় বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি কমে গেলে ছোট ও মাঝারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চ সুদহার এবং কঠোর আর্থিক পরিস্থিতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন করে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতাও সীমিত।

এরই মধ্যে এআই ক্লাউড কম্পিউটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কোরউইভের শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির এআই অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয় ও ঋণনির্ভর বিনিয়োগ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণখেলাপি ঝুঁকির বিপরীতে বিমা ব্যয়ও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা বাড়ছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের ফলে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য স্থানীয় সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে—এমন উদ্বেগও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় আসছে।

এশিয়ার কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী লি হিয়ং-ইল ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম সাময়িকভাবে শিথিল করেছেন। অন্যদিকে রয়টার্সকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, তাইওয়ানের অর্থ মন্ত্রণালয় সকালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাজারে সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

এসব পদক্ষেপের পর দিনের শেষ ভাগে কয়েকটি বাজারে পতনের গতি কিছুটা কমে আসে। তবে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সিএমসি মার্কেটসের প্রধান ক্রিস্টোফার ফোর্বস পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, অনেক গ্রাহক সূচক ও বিভিন্ন শেয়ারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিলেন। বাজারের আকস্মিক পতনে তাঁদের অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন। দিনজুড়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মার্জিন কল ও অভিযোগ এসেছে।

শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি বন্ড ও নিরাপদ মুদ্রার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের পাশাপাশি জাপান ও চীনের সরকারি বন্ডেও বিনিয়োগ বাড়তে দেখা গেছে।এ সময় মার্কিন ডলারের পাশাপাশি জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর চাহিদাও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার কমে ৪ দশমিক ৮৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত ৯ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। অন্যদিকে জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার একপর্যায়ে ৯ ভিত্তি পয়েন্ট কমে ১ দশমিক ৭৯৫ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ৩০ জুনের পর সর্বনিম্ন।

সব মিলিয়ে এআই খাতের ভবিষ্যৎ, বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কা বিশ্ব শেয়ারবাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে এআই খাতের বিনিয়োগ ও মুনাফার বাস্তব চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে