×
ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

‘আসুন, ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ পাঠাব’

২০২৬ নভেম্বর ০২ ১৮:৪৩:১২
‘আসুন, ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ পাঠাব’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। আসামে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি রাহুলের এত দরদ থাকলে সেখানে গিয়ে নির্বাচন করার পরামর্শও দিয়েছেন হিমন্ত।

রোববার (১ নভেম্বর) হিমাচল প্রদেশের শিমলায় বিজেপির এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে এসব মন্তব্য করেন তিনি। হিমন্তের এই বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে চলমান বিরোধের প্রেক্ষাপটে মন্তব্যটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

শিমলার ওই কর্মসূচিতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি রাহুল গান্ধীর এত দরদ থাকলে তার বাংলাদেশে গিয়ে নির্বাচন করা উচিত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিদের প্রতি আপনার যদি এতই দরদ থাকে, তাহলে বাংলাদেশে যান। সেখানে গিয়ে নির্বাচন লড়ুন।’

রাহুল গান্ধীকে আসামে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে হিমন্ত আরও বলেন, তিনি এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী মিলে রাহুলকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে মন্তব্য করেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী।

হিমন্তের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা। তার অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন রাহুল। বিজেপি নেতার দাবি, কংগ্রেসের এই অবস্থান অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা।

হিমন্তের মন্তব্যের আগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের এক সমাবেশে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন রাহুল গান্ধী। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে রাহুল বলেন, ভোট চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রাহুলের এসব বক্তব্যের পরই বিজেপির পক্ষ থেকে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু হয়। শিমলার কর্মসূচিতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা শুধু বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই রাহুলকে আক্রমণ করেননি, কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কটাক্ষ করেন।

তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস আর কখনো ভারতের ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। তার বক্তব্য, ইভিএম কিংবা ব্যালট পেপার—কোনো পদ্ধতিতেই কংগ্রেসের পরাজয় ঠেকানো যাচ্ছে না। বিজেপি ভোট চুরি করে না, বরং মানুষের মন জয় করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য বুঝতে হলে আসামের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের বিষয়।

১৯৭৯ সালে বিদেশি নাগরিক শনাক্ত ও বহিষ্কারের দাবিতে আসামে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে চলা আন্দোলন প্রায় ছয় বছর স্থায়ী হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম সরকার ও আন্দোলনকারী নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘আসাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তিতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই তারিখের পর আসামে আসা বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন বা এনআরসি হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। বাদ পড়েন প্রায় ১৯ লাখ মানুষ।

তবে এনআরসির তালিকায় নাম না থাকলেই কেউ বিদেশি নাগরিক হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হন না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের দাবি যাচাই ও আপিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়া বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়েও ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিরোধ চলছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন পক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, দ্বৈত ও অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দিয়ে তালিকা হালনাগাদ করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।

রাহুল গান্ধী এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে আসছেন। তার অভিযোগ, ভোটার তালিকায় কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। দিল্লির রামলীলা ময়দানের সমাবেশেও তিনি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন তোলেন।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের বিষয়টি বহু বছর ধরে নির্বাচনী বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে অনুপ্রবেশের অভিযোগ, নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—এগুলো পৃথক বিষয়। রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্য তাই রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে দেওয়া রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি ভারতের নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ ও ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান বিতর্ককেও সামনে এনেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

জাহিদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে