×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হালাল বাজারে বাংলাদেশের বড় সুযোগ, আসছে নতুন পরিকল্পনা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ০৭:৫০:২৮
হালাল বাজারে বাংলাদেশের বড় সুযোগ, আসছে নতুন পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে হালাল পণ্যের বাজার। বর্তমানে বৈশ্বিক হালাল বাজারের আকার প্রায় ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বাড়াতে হালাল পণ্যের সনদ প্রদান, মান পরীক্ষা ও রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিসিআই এ খাতের জন্য ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে হালাল সনদ দেওয়ার কারণে রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে সনদ প্রদান, মান যাচাই, পরীক্ষাগার পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় আরও সহজ হতে পারে।

বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম পারভেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের বাজার প্রায় ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বছরে গড়ে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব মাত্র ০ দশমিক ০৫ শতাংশ।

বিসিআই বলছে, বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক হালাল বাজারের মাত্র ৫ শতাংশও ধরতে পারে, তাহলে এ খাত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯৪ কোটি ডলার বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনটির মতে, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে হালাল পণ্যের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এসব অঞ্চলে মুসলিম ভোক্তার পাশাপাশি অমুসলিমদের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে হালাল পণ্য রপ্তানি করছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কৌশল না থাকায় এ খাতের অধিকাংশ উদ্যোগ এখনো বেসরকারি পর্যায়ের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে হালাল সনদ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) হালাল সনদ দেওয়ার কার্যক্রমে যুক্ত হয়। বিসিআইয়ের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিদেশি বাজারে সনদ গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রপ্তানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হয়।

এ কারণে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো সম্ভাবনাময় বাজারের সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি করার সুপারিশ করেছে বিসিআই। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ওআইসি-এসএমআইআইসির কাছ থেকে কারিগরি সহায়তা নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

হালাল পণ্যের ক্ষেত্রে এখন শুধু প্যাকেটের গায়ে একটি হালাল লোগো থাকাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পণ্যের উৎস-সন্ধান বা ট্রেসেবিলিটির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে মাংসজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রাণীর উৎস, খাদ্য, টিকাদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাই এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের তথ্যও জানতে চাইছেন ক্রেতারা।

ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার না থাকায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মান পরীক্ষার সনদ নিতে হচ্ছে। এতে পরীক্ষার খরচ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য রপ্তানিতে সময়ও বেশি লাগছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

হালাল সনদ প্রদানের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত খরচ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ ধরনের সমস্যা দূর করতে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও কম খরচের করার দাবি জানানো হয়েছে।

হালাল পণ্যের রপ্তানি আরও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য আলাদা ‘হালাল এইচএস কোড’ চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে বিসিআই। পাশাপাশি দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হালাল মেলার আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক হালাল বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে সংগঠনটি। দীর্ঘমেয়াদে হালাল পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে জাতীয় হালাল নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়েছে।

বিসিআই ২০৩৪ ও ২০৪০ সালের জন্য নির্দিষ্ট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ বছরের নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বৈশ্বিক হালাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে