×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংকের টাকা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, মূলধন সংকটে ২১ ব্যাংক!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ১১:৪৮:৩৯
ব্যাংকের টাকা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, মূলধন সংকটে ২১ ব্যাংক!

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট আরও গভীর হয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং এর বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতার কারণে চলতি বছরের মার্চ শেষে ২১টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। তিন মাস আগে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় হয়েছে। এরপরও মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ব্যাংকিং খাতের নিট মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধন ঘাটতি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমার পাশাপাশি মূলধন ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়লে তার বিপরীতে বেশি প্রভিশন রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং লোকসান হলে মূলধন ঘাটতি আরও বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতির ওপর।

সাধারণত ভালো বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে তুলনামূলক কম হারে প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু কোনো ঋণ খেলাপি হলে তার শ্রেণি ও ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী অনেক বেশি প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। কিছু ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে শতভাগ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হতে পারে।

এই প্রভিশন মূলত আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি মোকাবিলার জন্য রাখা হয়। কিন্তু খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ প্রভিশনে আটকে যায়। এতে মুনাফা কমে এবং মূলধনও দুর্বল হয়।

২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এদিকে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠনে চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হতে পারে। কারণ ব্যাংকের মূলধন আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মূলধন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে একটি বা একাধিক ব্যাংকের দুর্বলতা পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশের ব্যাংকিং খাতকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করে। ফলে অনেক ব্যাংক দুর্বল অবস্থায় থাকলে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোকেও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের সিআরএআর আরও কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। ডিসেম্বর শেষে এটি ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

সিআরএআর মূলত একটি ব্যাংকের মূলধন এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর জন্য ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার প্রয়োজন হয়।

তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের শেষে পাকিস্তানের ব্যাংকিং খাতে সিআরএআর ছিল প্রায় ২১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ শতাংশের বেশি এবং ভারতে ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রয়োজনীয় মূলধন ও সিআরএআর বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ব্যাংককে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ও আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এর মধ্যে লভ্যাংশ ও প্রণোদনা বোনাসে বিধিনিষেধ, ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়া, আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস এবং অর্থায়নের ঝুঁকি বৃদ্ধির মতো বিষয় রয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংকের ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধন সংকট—এই তিনটি বিষয় এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ আদায় বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে