×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হুমকির মুখে বাংলাদেশের ১৪ হাজার কেজি স্বর্ণ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৯:৫০:১১
হুমকির মুখে বাংলাদেশের ১৪ হাজার কেজি স্বর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেয়ারবাজারে বড় পতন, মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি কিংবা ভূরাজনৈতিক সংকট—অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যন্ত অনেকেই স্বর্ণের ওপর নির্ভর করেন।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বে শুধু কত টন স্বর্ণ একটি দেশের কাছে আছে, সেটিই আর একমাত্র প্রশ্ন নয়। ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—দেশটির স্বর্ণ কোথায় রাখা আছে এবং সংকটের সময় সেই স্বর্ণের ওপর রাষ্ট্রের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে?রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদ আটকে দেওয়ার ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

স্বর্ণ কোনো নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা বা সরকারের ঋণপত্র নয়। ফলে কোনো দেশের অর্থনীতি বা মুদ্রার ওপর আস্থা কমে গেলেও স্বর্ণের নিজস্ব বাজারমূল্য থাকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি স্বর্ণও মজুত রাখে। এর একটি বড় কারণ হলো—স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করে।

বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে স্বর্ণের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিলে স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্বের অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐতিহাসিকভাবে তাদের স্বর্ণের একটি অংশ দেশের বাইরে সংরক্ষণ করেছে। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে স্বর্ণ রাখার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে।

এসব কেন্দ্রের বড় ভল্ট, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে স্বর্ণ দ্রুত লেনদেন বা জামানত হিসেবে ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের মতো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ সংরক্ষণ করে আসছে।অর্থাৎ বিদেশে স্বর্ণ রাখা মানেই যে নিরাপত্তাহীনতা—বিষয়টি এত সরল নয়।বর্তমান ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি থেকে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পর দেশটির বিপুল বৈদেশিক সম্পদ আটকে দেওয়ার ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—কোনো দেশের সম্পদ যদি অন্য দেশের বিচারব্যবস্থা বা আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় থাকে, তাহলে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের সময় সেই সম্পদ ব্যবহারের স্বাধীনতা কতটা থাকবে?এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিভিন্ন দেশ নিজেদের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনা করছে।

নিজের দেশের ভল্টে স্বর্ণ রাখার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ওপর সরাসরি ভৌত নিয়ন্ত্রণ।বিদেশি নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে থাকা স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।এ ছাড়া জাতীয় সম্পদের একটি অংশ নিজ ভূখণ্ডে রাখাকে অনেক রাষ্ট্র আর্থিক সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করে।

তবে এর বিপরীত যুক্তিও রয়েছে। দেশের ভেতরে নিরাপদ ভল্ট তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা ও নিরাপত্তার ব্যয় কম নয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজনে বিদেশি আর্থিক কেন্দ্রে স্বর্ণ রাখার যে সুবিধা পাওয়া যায়, সেটিও হারাতে পারে কোনো দেশ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বর্ণ একটি অংশ হিসেবে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের স্বর্ণের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং এর কতটা দেশের ভেতরে বা বিদেশে সংরক্ষিত—এ ধরনের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সরকারি নথিকে ভিত্তি করা প্রয়োজন।

যদি দেশের স্বর্ণের একটি অংশ বিদেশে সংরক্ষিত থাকে, তাহলে তার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের সুবিধা, নিরাপত্তা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার মতো কারণ থাকতে পারে।অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় স্বর্ণের সংরক্ষণ কোথায় হবে, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এখন প্রশ্নটি শুধু ডলার বনাম স্বর্ণ নয়। বরং বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ, সরকারি বন্ড এবং অন্যান্য সম্পদের মধ্যে কীভাবে ঝুঁকি ভাগ করে রাখা যায়—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু দেশ স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে বিশ্ব ডলার ছেড়ে স্বর্ণের দিকে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী।ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনার প্রবণতা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের গুরুত্ব বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কিনলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকলেও এর দাম বাড়তে পারে।

তবে স্বর্ণও ঝুঁকিমুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক সুদের হার, ডলারের শক্তি, বিনিয়োগকারীদের আচরণ এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতির ওপর এর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে তাই স্বর্ণের ক্ষেত্রে দুটি নিরাপত্তা একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।একটি হলো ভৌত নিরাপত্তা—স্বর্ণ কোথায় নিরাপদে রাখা হয়েছে।অন্যটি হলো সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ—সংকটের সময় সেই স্বর্ণের ওপর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র কতটা স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারবে।

বিদেশে স্বর্ণ রাখলে আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের সুবিধা পাওয়া যায়, কিন্তু ভূরাজনৈতিক সংকটে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার দেশে রাখলে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক লেনদেনের কিছু সুবিধা কমতে পারে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা, তারল্য এবং মুনাফা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে, কতটা রাখা হবে এবং কীভাবে সংকটের সময় ব্যবহার করা যাবে—এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যত বেশি অনিশ্চিত হচ্ছে, ততই রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারছে—রিজার্ভ শুধু কত বড়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; প্রয়োজনের সময় সেই রিজার্ভের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেই কারণেই স্বর্ণ এখন কেবল অলংকার বা বিনিয়োগের ধাতু নয়; এটি ক্রমেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সার্বভৌমত্বের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে