×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রতি ১০ সেকেন্ডে ৩ জন ! ২০২৬-এ ক্যান্সার নিয়ে লুকানো সত্য

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১৮:১৮:২৯
প্রতি ১০ সেকেন্ডে ৩ জন ! ২০২৬-এ ক্যান্সার নিয়ে লুকানো সত্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন ও পরিবেশগত কারণে আগামী বছরগুলোতে এই রোগের বোঝা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তবে আশার কথা হলো, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ নতুন ক্যান্সারের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ডব্লিউএইচওর ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) ২০২৪ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। একই সময়ে এ রোগে মারা যান প্রায় ৯৮ লাখ মানুষ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, কার্যকর প্রতিরোধ ও চিকিৎসার উদ্যোগ না বাড়ালে ২০৫০ সালে বিশ্বে নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৪৪ লাখে পৌঁছাতে পারে।

আইএআরসির তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যান্সার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে নারীদের স্তন ক্যান্সার, বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ক্যান্সার, প্রোস্টেট এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ও চিকিৎসার সুযোগ সব দেশে সমান নয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে চিকিৎসা শুরু করেন, যা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যান্সার প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো না গেলে আগামী কয়েক দশকে রোগটির বৈশ্বিক বোঝা আরও বাড়বে।

২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও আইএআরসির যৌথ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে শনাক্ত হওয়া নতুন ক্যান্সারের প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ৭১ লাখ ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

গবেষণায় তামাক, অ্যালকোহল, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ, অতিবেগুনি রশ্মি এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিভিন্ন সংক্রমণকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় তামাককে ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধযোগ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১. তামাক ও ধূমপান: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ তামাকজাত পণ্য ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় তামাক।

২. বায়ুদূষণ: দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস ও কাজ করার কারণে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম দূষণকণা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

৩. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কয়েক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

৪. ক্যান্সার সৃষ্টিকারী সংক্রমণ: হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি), হেপাটাইটিস বি ও সি এবং হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরির মতো সংক্রমণ নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে ডব্লিউএইচও কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

১. তামাক ও অ্যালকোহল পরিহার: ধূমপান, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকতে হবে। অ্যালকোহল গ্রহণও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

২. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার গ্রহণ, ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা জরুরি।

৩. প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ: এইচপিভি ও হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ প্রতিরোধে বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার উপযোগী টিকা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংক্রমণ থেকে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

৪. দূষণ ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে সুরক্ষা: বায়ুদূষণ, অতিবেগুনি রশ্মি এবং কর্মক্ষেত্রে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বয়স, লিঙ্গ, পারিবারিক ইতিহাস ও ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যান্সার স্ক্রিনিং করানো উচিত।

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ (mRNA) ভ্যাকসিন। সম্প্রতি মডার্না ও মার্কের তৈরি একটি পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন নিয়ে তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

গবেষণায় উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা বা ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত ১ হাজার ১৩৭ জন রোগী অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের পর তাঁদের একদলকে প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি ও ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। অন্য দলকে দেওয়া হয় শুধু ইমিউনোথেরাপি।

প্রায় দুই বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভ্যাকসিন ও ইমিউনোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ৮২ দশমিক ২ শতাংশের ক্যান্সার ফিরে আসেনি। অন্যদিকে শুধু ইমিউনোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। গবেষণায় সম্মিলিত চিকিৎসায় ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই ভ্যাকসিন এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং সব ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় এটি কার্যকর—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণাটি মূলত অস্ত্রোপচারের পর উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। তাই এটিকে ক্যান্সারের সর্বজনীন টিকা বা নিশ্চিত নিরাময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অনেক ধরনের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। তামাক নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ কমানো, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসার সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

লাইফ স্টাইল এর সর্বশেষ খবর

লাইফ স্টাইল - এর সব খবর

উ
প
রে