×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

বিপাকে পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বড় সুখবর

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১২:০৪:০১
বিপাকে পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বড় সুখবর

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিঙ্গাপুরে বেতন না পেয়ে চাকরি হারানো ২৩০ জনের বেশি অভিবাসী শ্রমিকের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। নতুন চাকরির পাশাপাশি কয়েকজন শ্রমিক ইতোমধ্যে তাদের বকেয়া বেতনও পেয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা।

শনিবার (৮ নভেম্বর) সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবর থেকে বকেয়া বেতনের দাবিতে অভিযোগ জানানো ২৩০ জনের বেশি শ্রমিকের জন্য নতুন চাকরির ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম)। শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের অনবোর্ডিং সেন্টারে একটি কর্মসংস্থান মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে নির্মাণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এই শ্রমিকেরা ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ এবং ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়।

ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের একজন বাংলাদেশের রাজশাহীর ২১ বছর বয়সি রব্বানি মো. গোলাম। গত এপ্রিলে তিনি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। দুই মাসের বেতন বকেয়া থাকায় তার হাতে ১০ সিঙ্গাপুরি ডলারেরও কম অর্থ অবশিষ্ট ছিল। গত ৬ নভেম্বর একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন তিনি।

দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে রব্বানি বলেন, এখন আর আগের মতো দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। আবার বেতন আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। গত এক মাস ধরে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে চলতে হয়েছে বলেও জানান এই শ্রমিক।

একই প্রতিষ্ঠানের আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক ২৩ বছর বয়সি মো. সাব্বির আলম নভেম্বরের শুরুতে তার বকেয়া বেতন পেয়েছেন। তিনি জানান, বেতন পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে। বাংলাদেশে চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় এবার পরিবারের কাছে আবারও টাকা পাঠাতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তবে সব শ্রমিকের অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এ কর্মরত ২১ বছর বয়সি সায়মন ইসলাম এখনো নতুন নিয়োগকর্তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। গত অক্টোবরে তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে তার তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।

সিঙ্গাপুরে আসার জন্য নেওয়া ৬ হাজার ডলারের ঋণ এখনো পরিশোধ করতে হচ্ছে জানিয়ে সায়মন বলেন, বকেয়া বেতন ফেরত না পেলেও তাকে আবার কাজে ফিরতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’-এর প্রায় ১২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের মধ্যে অধিকাংশই বকেয়া বেতন পেয়েছেন বলে ওই প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন শ্রমিক জানিয়েছেন। তবে ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এর তিনজন শ্রমিক জানিয়েছেন, তারা এখনো বকেয়া বেতন পাননি।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান দুটির শ্রমিকেরা গত আগস্ট থেকে বেতন পাচ্ছিলেন না। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে কয়েক দফায় তাদের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়।

নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। নির্মাণ খাতেও কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অনেক শ্রমিক এই খাতে কাজ করতে আগ্রহী, কারণ সেখানে তুলনামূলক বেশি আয় করা সম্ভব।

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘ট্রানজিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু’ (টিডব্লিউসি২) গত আগস্টে প্রকাশিত এক জরিপে জানিয়েছে, নির্মাণ খাতে শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ৮৬৮ সিঙ্গাপুরি ডলার। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে গড় মাসিক আয় ৭৭১ সিঙ্গাপুরি ডলার। উভয় হিসাবেই ভাতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবে অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক বা ওভারটাইমের অর্থ হিসাব করা হয়নি।

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিক কেন্দ্র (এমডব্লিউসি) এবং জনশক্তি মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবি নিষ্পত্তি, নতুন কর্মসংস্থান, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করছে।

এমডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের অনবোর্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। সংস্থাটির সহায়তা পাওয়া ২৩০ জন শ্রমিকের ৯০ শতাংশের বেশি বকেয়া বেতনের দাবিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন।

এমডব্লিউসির পরিচালক মাইকেল লিম জানান, যেসব শ্রমিক নিজেরাই নতুন চাকরি খুঁজে পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করতে সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বকেয়া বেতনের দাবি নিষ্পত্তি ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণেও শ্রমিকদের পাশে থাকবে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ না করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কর্মসংস্থান আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে চলমান তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠান দুটি এবং তাদের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি মন্ত্রণালয়।

দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের আগের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান দুটির পরিচালকরা এর আগে এমন দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন, যেগুলোর মালিকানায় ছিলেন জুলাইয়ে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় একটি অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়।

এদিকে, প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বাংলাদেশি ব্যক্তি শ্রমিকদের নিয়োগ এবং বিভিন্ন কর্মস্থলে পাঠানোর কাজ করতেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

গত ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ হাইকমিশন জানায়, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং শ্রমিকদের সহায়তা ও তদন্তের বিষয়ে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

প্রবাস এর সর্বশেষ খবর

প্রবাস - এর সব খবর

উ
প
রে