×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

প্রাণঘাতী রোগের হুমকিতে জনপ্রিয় ফল কলা

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৬:৫১:২৯
প্রাণঘাতী রোগের হুমকিতে জনপ্রিয় ফল কলা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে কলা চাষ জলবায়ু পরিবর্তন ও ছত্রাকজনিত রোগের কারণে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে বহুল প্রচলিত ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা ট্রপিক্যাল রেস ৪ (টিআর৪) নামের এক মারাত্মক রোগের হুমকিতে রয়েছে। এই রোগ ছড়িয়ে পড়লে কলা উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং কলা চাষের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে গবেষকদের নতুন উদ্যোগ এই সংকট মোকাবিলায় আশার আলো দেখাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফল কলা। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টন কলা উৎপাদিত হয়। এক হাজারেরও বেশি জাতের কলা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে পরিচিত জাতগুলোর একটি ক্যাভেন্ডিশ। বর্তমানে বহু দেশে বাণিজ্যিকভাবে এই জাতের কলা উৎপাদন করা হয়।

কলা চাষের ইতিহাসে রোগের কারণে জনপ্রিয় জাত হারানোর নজির রয়েছে। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পানামা রোগের আক্রমণে ‘গ্রোস মিশেল’ জাতের কলার বাণিজ্যিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একসময় আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় এই জাতের জায়গা দখল করে ক্যাভেন্ডিশ।

ক্যাভেন্ডিশ কলা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর গাছগুলো সাধারণত ক্লোনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। ফলে গাছগুলোর জিনগত বৈচিত্র্য সীমিত থাকে। কোনো নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে জাতটির প্রতিরোধক্ষমতা কম হলে একই ধরনের গাছের বড় অংশ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ট্রপিক্যাল রেস ৪ বা টিআর৪ হলো মাটিবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ, যা কলাগাছের পানি পরিবহনব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আক্রান্ত গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। মাটিতে রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাক দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে বলে আক্রান্ত জমিতে কলা চাষ আবার শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নরউইচের আর্লহ্যাম ইনস্টিটিউটের ফসলের জিনোমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. হোসে দে ভেগার ভাষ্য অনুযায়ী, রোগটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ছড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বের শীর্ষ কলা রপ্তানিকারক দেশ ইকুয়েডরকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রোগটির বিস্তার অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে কলার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বহু মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ক্যাভেন্ডিশ কলার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই নতুন জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ নিয়েছে গবেষকেরা। কলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিকুইটা এবং ফসল উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা কি-জিনের যৌথ গবেষণা উদ্যোগ ‘ইয়েলোওয়ে’ জানিয়েছে, তারা প্রজননক্ষম ক্যাভেন্ডিশ কলার একটি জাত উদ্ভাবন করেছে।

এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রচলিত বাণিজ্যিক ক্যাভেন্ডিশ কলা সাধারণত বীজের মাধ্যমে সহজে বংশবিস্তার করে না। প্রজননক্ষম জাত ব্যবহার করে সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কলা উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধী এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনযোগ্য নতুন জাত তৈরির গবেষণা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে নতুন জাত উদ্ভাবনের খবরের অর্থ এই নয় যে ক্যাভেন্ডিশ কলার ওপর টিআর৪-এর হুমকি ইতোমধ্যে দূর হয়ে গেছে। নতুন জাতটি রোগের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর, ফলের গুণমান কেমন এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক উৎপাদনের উপযোগী কি না—এসব বিষয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

কলা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং একটি জনপ্রিয় বাণিজ্যিক জাতের সংকটে পড়া এক বিষয় নয়। কলার বহু জাত রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে কয়েকটি জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, কলার জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং রোগ প্রতিরোধী নতুন জাত উদ্ভাবন। পাশাপাশি আক্রান্ত জমি থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কৃষি ব্যবস্থাপনা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

গবেষণায় নতুন অগ্রগতি আশার সঞ্চার করলেও ক্যাভেন্ডিশ কলাকে নিরাপদ রাখতে আরও পরীক্ষা, গবেষণা ও কার্যকর কৃষিব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই কলা একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে বর্তমানে বড় উদ্বেগ হলো—বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই ফলের উৎপাদন ও সরবরাহ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর

উ
প
রে