×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ারবাজারে আসছে সিটি গ্রুপ, লক্ষ্য ১২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ২১:০৫:৪০
শেয়ারবাজারে আসছে সিটি গ্রুপ, লক্ষ্য ১২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকঋণ পুনর্গঠন এবং নতুন অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে দেশের এক সময়ের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ। এই লক্ষ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে গ্রুপটি। পাশাপাশি সম্পদ ও প্রকল্প বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, সিটি গ্রুপের প্রস্তাবিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে হোশেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকা ছয় থেকে সাতটি বড় প্রকল্প বিক্রি করে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সময়ের মধ্যে গ্রুপটির জমি বিক্রি করে আরও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঋণসংকট কাটাতে বিকল্প অর্থায়নের উদ্যোগ

সিটি গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন করে কার্যকরী মূলধন সরবরাহ নিয়ে ৩৬টি ঋণদাতা ব্যাংকের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। গ্রুপটি বিদ্যমান ঋণ ১২ বছরে পুনঃতফসিল করার পাশাপাশি নতুন করে ৬ হাজার কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন চেয়েছে। তবে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় নতুন অর্থায়নে সম্মত হতে পারছে না ব্যাংকগুলোর একটি অংশ।

ব্যাংকগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ, নতুন ঋণ দেওয়ার পরও পুরোনো দায় পরিশোধ নিশ্চিত না হলে তাদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে সম্পদ বিক্রি, নতুন মূলধন সংগ্রহ এবং ব্যবসার পুনর্গঠনকে ঋণসংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বাড়ানোর অনুমতি না দিলে ১ অক্টোবর থেকে সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ শ্রেণিকরণের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কথা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে বিপুল অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হতে পারে, যা তাদের মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

১২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিক্রির লক্ষ্য

সিটি গ্রুপের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হোশেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্পগুলো বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ। গ্রুপটির লক্ষ্য, ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে ছয় থেকে সাতটি বড় প্রকল্প বিক্রি করে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওয়া। পাশাপাশি জমি বিক্রির মাধ্যমে আরও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য কত, ক্রেতা পাওয়া যাবে কি না এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিক্রি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়। সম্পদ বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের কতটা বিদ্যমান ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে, সেটিও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সিটি গ্রুপের আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরির জন্য আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংসহ দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক অবস্থান, সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ও ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়ের পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকারদের আগের বৈঠকে গঠিত একটি কমিটিও সম্পদ মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা

সম্পদ বিক্রির পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করতে চায় সিটি গ্রুপ। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পেতে পারে। তবে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য ইস্যুর আকার, সময়সূচি, শেয়ার ছাড়ার ধরন কিংবা কত টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে—এসব বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যবসার স্থিতিশীলতা, করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ। সিটি গ্রুপের বর্তমান ঋণসংকটের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন।

ব্যবসা সচল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ

ঋণসংকটের প্রভাব সিটি গ্রুপের পণ্য সরবরাহ ও বিক্রিতেও পড়েছে। গ্রুপটির প্রস্তাব অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে বিক্রি প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। গত মার্চ থেকে পর্যাপ্ত ঋণপত্র বা এলসি খুলতে না পারায় পণ্য সরবরাহ কমেছে এবং বাজারে গ্রুপটির অংশীদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিটি গ্রুপের পণ্য তালিকায় ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চাল, ডাল, চিনি, গুঁড়া দুধ ও পশুখাদ্য রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা শুধু গ্রুপটির ব্যবসার জন্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিষ্ঠানটির ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের জন্য সম্পদ বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা উচিত। তাদের পরামর্শ, গ্রুপটি আগামী দুই বছরে চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দায় কমাতে পারে। এরপর ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধনের বিষয়টি ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করতে পারে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা সিটি গ্রুপের জন্য নতুন মূলধন সংগ্রহের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা, সম্পদ বিক্রির অগ্রগতি, ব্যাংকঋণ পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের ওপর।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে