×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

১৫ টাকার শেয়ার ৪২ টাকা, তারপর ১১ টাকা: ডাবল ধাক্কায় সর্বশান্ত বিনিয়োগকারীরা

২০২৬ অক্টোবর ২০ ১৮:১৬:৩৯
১৫ টাকার শেয়ার ৪২ টাকা, তারপর ১১ টাকা: ডাবল ধাক্কায় সর্বশান্ত বিনিয়োগকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে কারসাজির ভয়াল চক্র আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কবলে পড়ে আবারও রক্তক্ষরণ হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। চোখের পলকে একটি শেয়ারের অবিশ্বাস্য উত্থান আর পতন ঘটিয়ে শত শত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব ও ফতুর করে দেওয়া হয়েছে। সেই চক্রান্ত ও রোলারকোস্টার যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি—শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল মাত্র ১৫ টাকা। অথচ অলৌকিকভাবে কোনো শক্ত মৌলিক ভিত্তি বা ব্যবসায়িক পরিবর্তন ছাড়াই মাত্র দুই মাসের মাথায়—১২ আগস্ট সেই শেয়ারের দর লাফিয়ে উঠে যায় ৪২ টাকা ১০ পয়সায়!

স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে হঠাৎ শেয়ারটির দাম এভাবে লাফিয়ে ওঠা নিয়ে বাজারে ব্যাপক সন্দেহ জাগলে মাঠে নামে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ারটির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির নেপথ্যে কোনো বলয় বা কারসাজ চক্রের হাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেয় বিএসইসি।

তদন্তের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শেয়ারটিতে ধারাবাহিক দরপতন শুরু হয়, যা আর কোনোভাবেই ঠেকানো যায়নি। কারসাজ চক্র সুবিধাজনক দামে শেয়ার বেচে চম্পট দিলেও ফেঁসে যান সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

সেই ক্ষতকে আরও গভীর ও প্রাণঘাতী করে তোলে কোম্পানির সাম্প্রতিক ডিভিডেন্ডহীন বা 'নো ডিভিডেন্ড' ঘোষণা। একের পর এক নেতিবাচক খবরে সোমবার (১৯ অক্টোবর) দিনশেষে শেয়ারটির দর খাড়া নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ টাকা ২০ পয়সায়। অর্থাৎ, ৪২ টাকার চূড়া থেকে নেমে দর দাঁড়িয়েছে ১৫ জুনের তলানিরও নিচে! দুই মাসের মাথায় বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সিংহভাগ হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে।

এদিকে, টানা দুই বছর কোনো প্রকার ডিভিডেন্ড দিতে না পেরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চূড়ান্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়েছে কোম্পানিটি। 'বি' ক্যাটাগরি থেকে সোজা নিম্নমানের 'জেড' ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ সংক্রান্ত খবরের জের ধরে সোমবার (১৯ অক্টোবর) এক দিনেই দেশের শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ১১.৮১ শতাংশ।

ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত করপোরেট ঘোষণার কারণে এদিন শেয়ারটিতে সার্কিট ব্রেকার বা দরবৃদ্ধির কোনো সীমা ছিল না। ফলে দিনজুড়ে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। এদিন প্রায় ৯০.৯০ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়, যার মোট লেনদেন মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

ডিএসইর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। এ বিষয়ে আগামী ২৪ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে এবং এর জন্য রেকর্ড ডেট রাখা হয়েছে ১৯ নভেম্বর।

কোম্পানির ঘোষিত আর্থিক বিবরণীতেও দেখা গেছে চরম মন্দার চিত্র। ২০২৬ অর্থবছরে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) গুনেছে ২ টাকা ৩৯ পয়সা, যেখানে ঠিক আগের বছরও (২০২৫) শেয়ারপ্রতি ১১ পয়সা মুনাফা ছিল। লোকসানের খড়্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্যও (এনএভি) ১০ টাকা ০৮ পয়সা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ৬৮ পয়সায়। তবে কেবল শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো আগের বছরের ঋণাত্মক ১ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে সামান্য ইতিবাচক হয়ে ৫২ পয়সায় এসেছে।

বিএসইসির আইন মেনে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জেড' ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত করা হবে। বর্তমানে কোম্পানিটির ৩৬.৬৩ শতাংশ শেয়ার স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে, ৩১.৯৭ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এবং বাকি ৩১.৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চক্রান্তকারীরা সময়মতো মুনাফা তুলে কেটে পড়লেও বড় দরপতন ও ক্যাটাগরি অবনমনের চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে