×
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বকেয়া ৪৪১০ কোটি টাকা

৬ লাইফ ইন্সুরেন্সে লালবাতি, বিপদে লাখ লাখ গ্রাহক

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১৮:২৪:২৭
৬ লাইফ ইন্সুরেন্সে লালবাতি, বিপদে লাখ লাখ গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বিমা খাতে চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও আস্থার সংকট নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের ছয়টি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ‘লাইফ ফান্ড’ বা জীবন তহবিল ঋণাত্মক (নেগেটিভ) পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে বিমা খাতের এই দেউলিয়া ও ভঙ্গুর চিত্র উঠে এসেছে।

বিমা খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ‘লাইফ ফান্ড’ হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের সেই সংরক্ষিত অংশ, যা দিয়ে ভবিষ্যতে গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা মেটানো হয়। কোনো কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো—প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক মূলভিত্তি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে এবং মেয়াদ শেষে গ্রাহকের পাওনা টাকা পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ বা সম্পদ তাদের হাতে নেই।

আইডিআরএ-এর হিসাব অনুযায়ী, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১,১২০ কোটি টাকা (১১.২ বিলিয়ন টাকা)। অন্যান্য পাঁচটি সংকটাপন্ন কোম্পানির মধ্যে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৩২৭ কোটি টাকা, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৯৪ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে।

চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে মোট অনাদায়ী বা বকেয়া বিমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪,৪১০ কোটি টাকারও বেশি (৪৪.১ বিলিয়ন টাকা)। উদ্বেগের বিষয় হলো, পুরো খাতের এই বিশাল বকেয়ার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এককভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে সাধারণ বিমা গ্রাহকদের পাওনা রয়েছে প্রায় ৩,৩১০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদ পূর্তির টাকা না পেয়ে লাখ লাখ গ্রাহক চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

আটকে থাকা টাকা দ্রুত মেটাতে উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ৩টি ধাপে মোট ১৬,০৫৮ জন গ্রাহকের মাঝে প্রায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি (৪ অক্টোবর) তৃতীয় ধাপে ৬টি বিমা কোম্পানির ৭,৬৪১ জন গ্রাহকের অনুকূলে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয়। এর আগে প্রথম দুই ধাপে ৮,৪১৭ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আইডিআরএ-এর এই পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও ৪,৪১০ কোটি টাকার পাহাড়সম বকেয়ার তুলনায় এই পরিশোধের পরিমাণ খুবই নগণ্য, যা মাত্র ১.৪৫ শতাংশ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আংশিক টাকা বিতরণ করে বিমা খাতের এই গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত রক্ষা ও বিমা খাতের প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বিমা কোম্পানিগুলোর প্রকৃত সম্পদ ও দায়ের নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সাধারণ গ্রাহকদের পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে