×
ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাকা লোপাটের অভিনব কৌশল, ‘নগদ’ নিয়ে অনুসন্ধানে যা মিলল

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১২:১০:৪৩
টাকা লোপাটের অভিনব কৌশল, ‘নগদ’ নিয়ে অনুসন্ধানে যা মিলল

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন ভাতার অর্থ সরিয়ে নেওয়া ও পরে সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের অভিযোগের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট, ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও এবং ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্রের বরাতে জানা যায়, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন ভাতার ৩২ হাজার ৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৪ টাকা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এসব অর্থ সরকারি সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে ই-মানি হিসেবে পাঠানো হতো। কোনো কারণে কোনো ভাতাভোগী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্থ উত্তোলন না করলে তা তার ওয়ালেটেই থাকার কথা ছিল।

তবে দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, মৃত্যু, পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণে যেসব ভাতাভোগীর ওয়ালেটে অর্থ পড়ে থাকত, সেসব অর্থ সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে অন্য ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ কাজে ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট ব্যবহারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। পরে এসব ওয়ালেট থেকে অর্থ ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসওর ওয়ালেটে স্থানান্তর করা হতো।

অনুসন্ধান অনুযায়ী, পরবর্তী ধাপে ওই অর্থ ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে বিভিন্ন স্তরে অর্থ স্থানান্তর ও ঘোরানোর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাব থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।

অর্থ সরানোর কাজে ব্যবহৃত ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মধ্যে অন্তত আটটির নাম দুদকের নথিতে উঠে এসেছে। এগুলো হলো—অ্যাস্থেটিক ডেভেলপমেন্ট, এআরএ ডেভেলপার, ডিজিটাল সেন্টার ডিস্ট্রিবিউশন, কল্লোল ডিস্ট্রিবিউশন, এলবি নিটওয়্যার, পাইনউড ডিস্ট্রিবিউশন, রহমান ডিস্ট্রিবিউশন ও ইউডিসি ডিস্ট্রিবিউশন। দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ একাধিক হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে ঘোরানো হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, এভাবে সরিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ ‘নগদ’ পরিচালনাকারী থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের শেয়ার কেনায় ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার কিনতে প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি ভাতার অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পর তা নগদ অর্থ হিসেবে না রেখে কোম্পানির শেয়ারে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। সরকারি অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা না এনে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর, শূন্য কুপন বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত মূলধন দিয়ে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং নিজের ও স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বরের একটি চুক্তির মাধ্যমে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডকে ‘নগদ’ মোবাইল আর্থিক সেবার মাস্টার এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই চুক্তিতে রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের অংশ ৫১ শতাংশ এবং থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের অংশ ৪৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘নগদ’-এর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ করে।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, সরকারি ভাতার অর্থ দিয়ে কেনা শেয়ার পরবর্তীতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের নামে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার হোল্ডিংস, মিয়ার্স হোল্ডিংস, সেঞ্চুরি অনলাইন, চৌধুরী বেঙ্গল ফিনটেক, ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস, তাসিয়া হোল্ডিংস, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট, ফিনটেক হোল্ডিংস, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স ও ইএসওপি হোল্ডিংসের নাম এসেছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। এসব শেয়ার বিক্রি করে অর্থ বিদেশে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই এসব শেয়ার বিক্রি, হস্তান্তর বা স্থানান্তর করা হলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছে দুদক। এ কারণে তানভীর আহমেদ মিশুকসহ অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার, যার মূল্য প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা, অবরুদ্ধ করার আবেদন করা হয়।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এসব শেয়ার অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। আদালতের আদেশে সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর বা বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদেশের কপি যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, ‘নগদ’-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর আবেদনও করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা এসব তথ্য বর্তমানে অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধান শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে