×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাগরের সংকটে বড় বিপদে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ১৫:৪০:৩০
সাগরের সংকটে বড় বিপদে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প!

নিজস্ব প্রতিবেদক: লোহিত সাগরে চলমান নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছায়। কিন্তু লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজকে বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে ইউরোপে যেতে হচ্ছে।

এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘ এই পথের কারণে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময়ও লাগছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কোনো কোনো চালান ইউরোপে পৌঁছাতে ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বেশি সময় নিতে পারে।

পোশাক শিল্পের জন্য এই বিলম্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ, জরিমানা কিংবা অর্ডার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে জাহাজের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ও বিমা ব্যয়। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পণ্য পরিবহনের খরচ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইউরোপের ক্রেতারা অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় গ্রহণ করলে রপ্তানিকারকদের চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু ক্রেতারা যদি বাড়তি খরচের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক ব্যয় আরও বাড়বে।

বিশেষ করে টি-শার্টের মতো তুলনামূলক কম দামের পোশাকের ক্ষেত্রে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দাম বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একইভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে অর্ডার বাতিল বা পরবর্তী অর্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলো। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও দীর্ঘ সময়ের ধাক্কা সামলানো তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

শুধু পোশাক রপ্তানিই নয়, লোহিত সাগরের সংকটের কারণে ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে আসা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ পরিবহনেও বিলম্ব হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া দীর্ঘ সমুদ্রপথের সঙ্গে জাহাজের বিমা ব্যয় এবং যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে। ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সামগ্রিক ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তাই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা, সময়মতো শিপমেন্ট পরিকল্পনা, ক্রেতাদের সঙ্গে আগাম সমন্বয় এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের বোঝা কীভাবে ভাগ করা যায়, সে বিষয়ে দ্রুত কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে লোহিত সাগরের পরিস্থিতি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে