×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পত্রিকার জন্য এত টাকা কোথায় পেলেন সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৬:২১:১১
পত্রিকার জন্য এত টাকা কোথায় পেলেন সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের নতুন ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’ প্রকাশের উদ্যোগ ঘিরে এর অর্থায়ন ও বিনিয়োগের উৎস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পরপরই নতুন একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনা উদ্যোগ সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যম অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠছে।

পত্রিকাটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এর পেছনে কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, বিনিয়োগের উৎস কী এবং কারা এই প্রকল্পের সঙ্গে আর্থিকভাবে যুক্ত—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো জনসমক্ষে বিস্তারিতভাবে আসেনি।

শফিকুল আলম দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিবের দায়িত্ব নেন।

সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে নিজের সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়াকে কেউ কেউ তার সাংবাদিকতা জীবনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, এত বড় একটি সংবাদপত্র চালু করতে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক মূলধন কোথা থেকে এলো এবং এর বিনিয়োগ কাঠামো কী?

একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু ছাপাখানা বা ওয়েবসাইট তৈরি নয়—সম্পাদকীয় ও রিপোর্টিং টিম, প্রযুক্তি, অফিস, বিপণন, প্রশাসনিক ব্যয় এবং দীর্ঘ সময়ের পরিচালন ব্যয়ও প্রয়োজন হয়। ফলে বিনিয়োগের উৎসের স্বচ্ছতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’র প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে এমজিএইচ গ্রুপের নাম সামনে এসেছে।এখানেই বিতর্কের মূল জায়গা। সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি নতুন সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শফিকুল আলমের সম্পর্ক কী এবং বিনিয়োগের শর্ত বা কাঠামো কী?

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, মালিকানা কাঠামো এবং সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে কি না—এসব বিষয়ও স্বচ্ছভাবে জানানো হলে বিতর্ক অনেকটাই কমতে পারে।

এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই এ ধরনের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে মামলার সুনির্দিষ্ট বিবরণ, বর্তমান আইনি অবস্থান এবং আদালতের সিদ্ধান্ত যাচাই করে উপস্থাপন করা জরুরি।শুধু মামলা থাকার তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতাগতভাবে যথাযথ নয়।

সমালোচকদের একটি বড় প্রশ্ন হলো—শফিকুল আলম যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তখন এমজিএইচ গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে তার কোনো প্রশাসনিক যোগাযোগ বা সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল কি না।

কেউ সরকারি দায়িত্বে ছিলেন এবং পরে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান একটি সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে—এই দুটি তথ্য থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিনিময় চুক্তির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তবে যদি সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং পরবর্তীতে একই পক্ষের সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগের মধ্যে সরাসরি আর্থিক বা চুক্তিগত যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি অবশ্যই জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠবে।

একটি নতুন সংবাদপত্রের জন্য বিনিয়োগকারী থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বের অনেক সংবাদমাধ্যমই ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিনিয়োগকারী বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত হয়।কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থের উৎস ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার স্বচ্ছতা।

পাঠকদের জানা দরকার—পত্রিকাটির মালিকানা কার?প্রধান বিনিয়োগকারী কারা?মোট বিনিয়োগের পরিমাণ কত?বিনিয়োগের অর্থের উৎস কী?বিনিয়োগকারীদের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা থাকবে কি না?সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় নীতি ও মালিকানার কাঠামো কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত স্পষ্ট হবে, সংবাদমাধ্যমটির ওপর পাঠকদের আস্থাও তত বেশি তৈরি হবে।

অর্থায়ন নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য। শফিকুল আলমের কাছে বিনিয়োগের পরিমাণ, অর্থের উৎস, মালিকানা কাঠামো এবং এমজিএইচ গ্রুপের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।

একইভাবে এমজিএইচ গ্রুপের কাছ থেকেও বিনিয়োগের ধরন, অর্থের উৎস এবং সংবাদপত্রটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।অভিযোগের জবাব প্রকাশ করা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার নয়; এটি একটি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন সাংবাদিক বা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন কি না—এটি নিজে কোনো প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং বিনিয়োগের সঙ্গে কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে কি না।

বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি সম্প্রতি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে তার পরবর্তী ব্যবসায়িক বা গণমাধ্যম উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’ শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও পেশাদার সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি এর মালিকানা ও অর্থায়ন নিয়ে বিতর্কই প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়ের বড় অংশ হয়ে দাঁড়াবে—তা নির্ভর করবে এর অর্থায়ন, মালিকানা ও সম্পাদকীয় কাঠামো কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয় তার ওপর।

এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’ প্রকাশের জন্য অর্থ এসেছে কোথা থেকে, কারা বিনিয়োগ করেছে এবং সেই অর্থের সঙ্গে কোনো স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না? এই প্রশ্নের উত্তরই বিতর্কের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে