×
ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অতঃপর বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার দরজা খুলেছে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৬:১২:৩৬
অতঃপর বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার দরজা খুলেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালী ঘিরে ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতা নতুন করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোকেও এর মূল্য দিতে হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো লোহিত সাগর। এর দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালী, যা আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে। এই পথ পেরিয়েই জাহাজগুলো সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে পারে।ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাব আল-মানদেব ভৌগোলিকভাবে সরু হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এ পথ দিয়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়।

লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালে প্রবেশ করলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার সমুদ্রপথ তুলনামূলকভাবে ছোট হয়। কিন্তু নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলো যদি এই পথ এড়িয়ে যায়, তাহলে তাদের আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে যেতে হয়।এর ফলে যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

লোহিত সাগর এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে গেলে জাহাজের যাত্রাপথ উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ হয়। এর সঙ্গে বাড়ে জ্বালানি খরচ, ক্রু ব্যয়, বিমা ব্যয় এবং জাহাজ ব্যবহারের সময়।

ফলে কোনো পণ্য যেখানে স্বাভাবিক রুটে প্রায় ২৮ দিনে পৌঁছাতে পারে, বিকল্প রুটে সেখানে প্রায় ৪৫ দিন বা তার কাছাকাছি সময় লাগতে পারে—যদিও প্রকৃত সময় নির্ভর করে জাহাজের গতি, রুট, বন্দরের অপেক্ষা এবং আবহাওয়ার ওপর।এই অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়।

লোহিত সাগরের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পোশাক রপ্তানিকারকদের কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে—পণ্য পরিবহনের সময় বেড়ে যাওয়া;কনটেইনার ও জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি;জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া;নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারার ঝুঁকি;ক্রেতাদের কাছ থেকে জরিমানা বা অর্ডার হারানোর আশঙ্কা;উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা।বিশেষ করে দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন এমন অর্ডারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কয়েক সপ্তাহের পরিবহন সময় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ শুধু রপ্তানির জন্য নয়, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল।সমুদ্রপথের দূরত্ব বাড়লে শুধু জাহাজভাড়া নয়, পণ্যের সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য এবং বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে।ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে এর পরোক্ষ প্রভাব দেশের মূল্যস্ফীতিতেও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে আমদানির মোট খরচও বাড়তে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাড়লেই বাংলাদেশে জ্বালানির দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার, সরকারি মূল্যনীতি, মজুত ও আমদানি চুক্তিসহ আরও অনেক বিষয় এখানে ভূমিকা রাখে।তারপরও দীর্ঘস্থায়ী নৌপথ সংকট জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

ইয়েমেনের হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে লোহিত সাগর ও আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা ও হুমকি দিয়ে আসছে। তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিরও যোগ রয়েছে।

সৌদি আরব সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।

তবে কোনো পক্ষের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে নির্দিষ্ট দাবি যাচাই করা জরুরি। কারণ লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় সামরিক তৎপরতা, জাহাজে হামলা, সতর্কতা এবং কূটনৈতিক বিবৃতি সামনে এসেছে; এগুলোকে একক কোনো ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।লোহিত সাগরের সংকটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বড় সামরিক শক্তি সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে হুথিদের সঙ্গে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে পারে। এর ফলে শুধু লোহিত সাগর নয়, উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।তখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজের বিমা এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর একযোগে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুঁকিটিকে আগেভাগে মূল্যায়ন করা। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত, আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সরবরাহ পরিকল্পনা এবং শিপিং খরচের ওপর নজর রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের বিকল্প পরিবহন রুট, সময়ভিত্তিক সরবরাহ পরিকল্পনা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে আগাম সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ হওয়ায় এর প্রভাব ইউরোপ থেকে এশিয়া—সবখানেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পরিবহন ব্যয়, পণ্য সরবরাহের সময় এবং জ্বালানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ। সংকট স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সামলানো সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে পোশাক রপ্তানি, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়তে পারে।

তাই বাব আল-মানদেবের পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশের জন্যও শুধু একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক খবর নয়; এটি বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে