ঢাকা, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

প্রভিশন ঘাটতিতে বিপর্যস্ত তিন ব্যাংক, প্রকৃত আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

২০২৬ মে ২০ ২১:১৮:৪২
প্রভিশন ঘাটতিতে বিপর্যস্ত তিন ব্যাংক, প্রকৃত আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তিন ব্যাংক—দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ ঝুঁকি এবং আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্যের তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষকদের “এমফ্যাসিস অব ম্যাটার” ও “অদার ম্যাটার” অনুচ্ছেদে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৩৮৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৭ হাজার ২৮৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা, কিন্তু ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে মাত্র ১ হাজার ১৯৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ফলে এই খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

অন্যদিকে অশ্রেণীকৃত ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ১১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ২ হাজার ৬৮৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, অথচ সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৩৯৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এতে আরও ২ হাজার ২৮৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ১ হাজার ৬২৯ কোটি ৮ লাখ টাকা, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৪০৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এতে এ খাতে ১ হাজার ২২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি গ্র্যাচুইটি ফান্ড, অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেম এবং শেয়ারে বিনিয়োগের বিপরীতে যথাক্রমে ১৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ৯৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ১০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতির বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৯৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিলের এক চিঠির মাধ্যমে এই ঘাটতি সমন্বয় ছাড়াই ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার অনুমতি দিয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বেজেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল ৪ হাজার ৪৯৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যাংকের রেকর্ডকৃত মূলধন ছিল ঋণাত্মক ৪ হাজার ৮৩৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়াতে পারত ৯ হাজার ৩৩০ কোটি ২১ লাখ টাকা।

মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও ব্যাংকটি প্রায় ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ সিআরএআর দেখিয়েছে। তবে পূর্ণ প্রভিশন ঘাটতি বিবেচনায় নিলে সিআরএআর ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে যেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংকটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডে ব্যাংকের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সমন্বিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটি এই ক্ষতির বিপরীতে কোনো ইমপেয়ারমেন্ট লস হিসাবভুক্ত করেনি।

অন্যদিকে “অদার ম্যাটার” অংশে নিরীক্ষক উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-২৪ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন ও সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলেও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা নোট ৩.১০-এ উল্লিখিত তথ্য ছাড়া অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট পক্ষের তথ্য প্রকাশ করেনি।

একইভাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, বহিঃনিরীক্ষক এবং ব্যাংকের মধ্যে ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকটির বিনিয়োগ, অফ-ব্যালেন্স শিট এক্সপোজার, শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগসহ অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে মোট প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮৩১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৯২৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ফলে ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯০৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ২৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী লোকসান আরও বেড়ে যেত এবং মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও অন্যান্য আর্থিক সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।

২০২৫ সালে ব্যাংকটি মোট ১ হাজার ৬৯৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার বিনিয়োগ আয় দেখিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার ভিত্তিতে ৯০ কোটি টাকা সমন্বয় করা হয়েছে, তবুও শ্রেণীকৃত বিনিয়োগ থেকে ২৪৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার আয় হিসাবভুক্ত করা হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে প্রফিট সাসপেন্স ও ক্ষতিপূরণ হিসাবের আওতায় স্থানান্তর করার কথা ছিল। এই সমন্বয় করা হলে ব্যাংকের ঘোষিত মুনাফা আরও কমে যেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডে যথাক্রমে ১৪৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং ৭৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বিএসইসির নির্দেশনায় বিলম্বিত প্রভিশনের কারণে প্রতিষ্ঠান দুটির নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) তুলনামূলক বেশি দেখানো হলেও শেয়ারদর পতনের কারণে প্রকৃত আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। একইসঙ্গে এসবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে ২৫০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজে ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতির তথ্যও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন খাতে ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনে এই ঘাটতি স্থগিত রেখে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।

ব্যাংকটির বিনিয়োগ ও অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট (এনপিআই) অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশে।

২০২৫ সালে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বিনিয়োগ ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেড়েছে। যদিও বছরের মধ্যে ৫২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা রাইট-অফ করা হয়েছে, পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় অতিরিক্ত কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি।

এ ছাড়া মোট বিনিয়োগের ১৬ শতাংশের বেশি অংশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় পুনঃতফসিল সুবিধা নেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড ও পুনঃতফসিল নগদ অর্থ আদায়ে বিলম্ব ঘটাতে পারে এবং ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যান্য সম্পদ, নন-ব্যাংকিং সম্পদ, অন্যান্য ব্যাংকে স্থাপিত অর্থ এবং গ্র্যাচুইটি খাতে আরও ৩৯৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতির তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিলের এক চিঠির মাধ্যমে পুরো প্রভিশন ঘাটতি স্বীকৃতি স্থগিতের অনুমতি দেয়। তবে নিরীক্ষক সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করায় বছরের মুনাফা বেশি দেখানো হয়েছে এবং এটি ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি বা সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না।

প্রতিবেদনে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেখানো হলেও পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলে কর-পরবর্তী লোকসান দাঁড়াত ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে আদায় ছাড়া প্রফিট রেন্ট সাসপেন্স হিসাব থেকে ২০ কোটি টাকা আয় হিসেবে দেখানো এবং আয়কর বাবদ ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখার অভিযোগও নিরীক্ষক তুলেছেন। এর ফলে ব্যাংকের নিট মুনাফা ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও দুর্বল অবস্থার কথা উঠে এসেছে। ব্যাংকটির সিআরএআর দেখানো হয়েছে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের নিচে। এতে মূলধনে ৬৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে। তবে পূর্ণ প্রভিশন সমন্বয় করা হলে সিআরএআর নেতিবাচক হয়ে যায়, যা মূলধন পরিস্থিতিকে সংকটপূর্ণ হিসেবে নির্দেশ করে।

এদিকে সহযোগী প্রতিষ্ঠান এআইবি ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেডের বিনিয়োগ মূল্য ১৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমে গেলেও বিপরীতে মাত্র ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার প্রভিশন রাখা হয়েছে। ফলে ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অতিরিক্ত প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংকের অংশ ৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের “অদার ম্যাটার” অংশে আরও উল্লেখ করা হয়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে মাত্র ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে