ঢাকা, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

রাষ্ট্রপতি বনাম সেনাপ্রধান: উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পুরো দেশ

২০২৬ মে ২০ ১৫:১১:৪৫
রাষ্ট্রপতি বনাম সেনাপ্রধান: উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পুরো দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯৬ সালের ২০ মে এক উত্তেজনাপূর্ণ ও নাটকীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্রসজ্জিত সেনাদল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। অন্যদিকে রাজধানীতে তাদের প্রতিহত করতে প্রস্তুতি নেয় সেনাবাহিনীর আরেকটি অংশ।

সে সময় দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর পর নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ঠিক এমন সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম ও রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস-এর মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছে যায়।

বিভিন্ন সূত্র ও প্রকাশিত বই অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৮ মে দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। তারা হলেন বগুড়া সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান এবং তৎকালীন বিডিআরের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমান।

সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম এ হাকিম তার বই ‘একটি সামরিক অভ্যুত্থান: ব্যর্থ প্রয়াস’-এ উল্লেখ করেন, এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে সেনাপ্রধান নাসিম রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং তার অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

২০ মে সেনাপ্রধান বিভিন্ন ডিভিশনে যোগাযোগ করে ঢাকায় সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেন। ময়মনসিংহ ও বগুড়া সেনানিবাস থেকে ব্রিগেড পর্যায়ের সেনাদল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যশোর থেকেও সেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এম এ মতিন তার বইয়ে দাবি করেন, সেনাপ্রধানের উদ্দেশ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিশেষ করে রেডিও-টেলিভিশন কেন্দ্র এবং বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির অনুগত সেনা কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাল্টা প্রস্তুতি নেন। সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান ও কুমিল্লার ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন সেনাপ্রধানের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান।

ঢাকামুখী সেনাদলকে প্রতিরোধ করতে শ্রীপুর, আরিচাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে সেনা মোতায়েন করা হয়। বঙ্গভবন, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও সেনা নিরাপত্তার আওতায় নেওয়া হয়।

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সেদিন রাজধানীর রাস্তায় ট্যাংক চলাচল করতে দেখা যায় এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, অনেক মানুষ ঘরে অবস্থান নেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ২০ মে বিকেলে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নাসিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ ঘোষণা প্রচার করা হয়।

রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, সেনাবাহিনীর আইন ও বিধি অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সেনাপ্রধানের আচরণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে জেনারেল নাসিম ওই সিদ্ধান্তকে “অবৈধ” বলে দাবি করেন।

যদিও সেনাবাহিনীর দুই অংশের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তবে কোথাও সরাসরি সংঘর্ষ বা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ঘটনার মাত্র ২২ দিন পর অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৬ সালের ২০ মে বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায়।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে