×
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

বাটন ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় পরিবর্তন, আসছে নতুন নিয়ম

২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১৭:১৫:৫০
বাটন ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় পরিবর্তন, আসছে নতুন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশজুড়ে টু-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি প্রযুক্তি সমর্থিত বাটন ফোনে প্রচলিত মোবাইল নম্বরে ভয়েস কল করা সম্ভব হবে না। তবে ফোরজি ও ভোল্টি (VoLTE) প্রযুক্তি সমর্থিত বাটন ফোন সচল থাকবে।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ কোটি ১৩ লাখ টু-জি ফোন ব্যবহার করছেন গ্রাহকেরা। এসব ফোনের বড় একটি অংশে ভোল্টি প্রযুক্তির সুবিধা নেই। ফলে নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে নতুন হ্যান্ডসেট কিনতে হতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি এবং সাধারণ যোগাযোগের জন্য বাটন ফোন ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন।

গত অক্টোবরে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে বিটিআরসি।

রোডম্যাপ অনুযায়ী, ধাপে ধাপে টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর হ্যান্ডসেটের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করা হবে। পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমাগুলো হলো—

ডিসেম্বর ২০২৬: নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন দেওয়া হবে না।

৩১ মার্চ ২০২৭: টু-জি ফোন উৎপাদন বন্ধের পরিকল্পনা রয়েছে।

৩০ জুন ২০২৭: টু-জি ফোন বাজারজাতকরণ বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ডিসেম্বর ২০২৯: গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি নেটওয়ার্ক সেবা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এ রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

যেসব বাটন ফোনে শুধু টু-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে, সেগুলোতে নেটওয়ার্ক বন্ধের পর প্রচলিত মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে না। কারণ এসব ফোনে ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সক্ষমতা নেই।

অন্যদিকে যেসব বাটন ফোনে ফোরজি ও ভোল্টি প্রযুক্তি রয়েছে, সেগুলো টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ বাটন ফোনের পরিবর্তে শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা এই পরিকল্পনায় নেই।

ভোল্টি বা ভয়েস ওভার লং টার্ম ইভোলিউশন (VoLTE) হলো ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সরাসরি মোবাইল ভয়েস কল করার প্রযুক্তি।

সাধারণত প্রচলিত ভয়েস কলের জন্য টু-জি বা থ্রি-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভোল্টি সুবিধা থাকলে ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা যায়।

এ ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা অন্য কোনো ইন্টারনেটভিত্তিক কলিং অ্যাপের প্রয়োজন হয় না। ফলে ভোল্টি সমর্থিত ফোনে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও প্রচলিত ভয়েস কল চালু রাখা সম্ভব।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ জানিয়েছেন, গ্রাহকদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ওভার দ্য টপ (ওটিটি) অ্যাপের ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি ভোল্টি প্রযুক্তির ব্যবহারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও মানুষ মোবাইলে কথা বলতে পারবেন। তখন ভোল্টি প্রযুক্তি অথবা বিভিন্ন ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে।বাটন ফোনের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাজারে এখনো কিছু ফোরজি ফোন পাওয়া যায়, যেগুলোতে ভোল্টি সুবিধা রয়েছে।

অন্যদিকে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, শুধু টু-জি সমর্থিত হ্যান্ডসেটগুলোর উৎপাদন বন্ধের বিষয়ে বিটিআরসি নির্মাতাদের নির্দেশনা দিয়েছে। এসব ফোনের সাধারণত তিন থেকে চার বছরের জীবনকাল বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষের হাতে এ ধরনের ফোনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ভোল্টি প্রযুক্তি কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল করা যাবে। ডেটা ব্যবহার করে কল করার ক্ষেত্রে প্রচলিত ভয়েস কলের তুলনায় খরচ কয়েক গুণ কম হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে ভোল্টি ও ইন্টারনেটভিত্তিক কলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভোল্টি দিয়ে সরাসরি যেকোনো প্রচলিত মোবাইল নম্বরে কল করা যায়। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপে কথা বলতে হলে উভয় পক্ষের ইন্টারনেট সংযোগ, সংশ্লিষ্ট অ্যাপ এবং ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হয়।

টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করা।

বর্তমানে দেশের বাজারে প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে সাধারণ বাটন ফোন পাওয়া যায়। এসব ফোনে কল করার পাশাপাশি টর্চ লাইট, এফএম রেডিও এবং মেমোরি কার্ড থেকে গান শোনার সুবিধা থাকে। কোনো কোনো ফোনে সীমিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে ফোরজি স্মার্টফোনের দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে যারা শুধু কথা বলা ও দৈনন্দিন সাধারণ কাজের জন্য ফোন ব্যবহার করেন, তাদের কাছে নতুন ফোন কেনা বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

দেশীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিম্ফনির স্বত্বাধিকারী এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ এ বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা যুক্ত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ চালু করা গেলে গ্রাহকদের মধ্যে ফোরজি ফোন ব্যবহারের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি কিস্তিতে হ্যান্ডসেট কেনার সুযোগও রাখা যেতে পারে।

তার মতে, মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে টু-জি থেকে ফোরজি প্রযুক্তিতে গ্রাহকদের স্থানান্তর সহজ করা সম্ভব।

সাশ্রয়ী দামে আধুনিক প্রযুক্তির ফোন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারও উদ্যোগ নিচ্ছে।

গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভুঁঞা জানান, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংযোগ নিশ্চিত করতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্টফোনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

এ লক্ষ্যে দেশে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে কম দামে স্মার্টফোন বাজারে এলেই সব গ্রাহকের পক্ষে নতুন প্রযুক্তিতে যাওয়া সহজ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, অনেক গ্রাহক স্মার্টফোনের পরিবর্তে বাটন ফোনকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেন।

দেশে এখনো অনেক বয়স্ক মানুষ এবং প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত গ্রাহক রয়েছেন, যারা টাচস্ক্রিন স্মার্টফোন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাদের কাছে বাটন ফোনই পরিচিত ও সহজ যোগাযোগের মাধ্যম।

এ ছাড়া অনেক মানুষ স্মার্টফোনের বাড়তি সুবিধা ব্যবহার করেন না। শুধু কল করা, রেডিও শোনা কিংবা টর্চ ব্যবহারের জন্য কম দামের বাটন ফোন কেনেন।লে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব গ্রাহকের প্রয়োজন ও আর্থিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। তবে একই সঙ্গে কোটি কোটি গ্রাহকের জন্য সাশ্রয়ী ফোরজি ও ভোল্টি সমর্থিত হ্যান্ডসেট নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠবে। বিশেষ করে সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহারকারীদের কথা বিবেচনায় রেখে কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি - এর সব খবর

উ
প
রে