×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বড় কিছু হতে যাচ্ছে, দেশে দেশে খাদ্য মজুতের কড়া নির্দেশ

২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৬:৫৫:১৯
বড় কিছু হতে যাচ্ছে, দেশে দেশে খাদ্য মজুতের কড়া নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইউরোপে সম্ভাব্য যুদ্ধ, সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিকদের আগাম প্রস্তুত থাকার ওপর জোর দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর অংশ হিসেবে প্রত্যেক পরিবারকে অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানীয় জল, ওষুধ এবং জরুরি সরঞ্জাম ঘরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ (Preparedness Union Strategy) নামের উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, কোনো বড় সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত যেন সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর উত্তেজনা, সাইবার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলো এখন শুধু সামরিক প্রতিরক্ষা নয়, বেসামরিক নাগরিকদের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে।

তবে এই প্রস্তুতির অর্থ যে ইউরোপে অবিলম্বে বড় যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তা নয়। বরং যুদ্ধসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি কমানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, আধুনিক সংকটের ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এখন একটি সাইবার হামলা, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সমস্যা কিংবা যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় পুরো দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করতে পারে।

বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বাল্টিক সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য নাশকতা এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আধুনিক যুদ্ধ শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, রেল যোগাযোগ, হাসপাতাল ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাও এখন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

কোনো কারণে এসব গুরুত্বপূর্ণ সেবা একযোগে বন্ধ হয়ে গেলে সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যেক নাগরিকের কাছে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সংকটের প্রথম ৭২ ঘণ্টা নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি পরিকল্পনায় জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাতের কাছে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশভেদে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকায় কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে নাগরিকদের জন্য যেসব জিনিস গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো হলো—

- পানীয় জল: পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অন্তত তিন দিনের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।

- শুকনো ও সংরক্ষণযোগ্য খাবার: টিনজাত খাবার, বিস্কুট, শুকনো খাবার এবং রান্না ছাড়াই খাওয়া যায় এমন খাদ্য।

- টর্চলাইট: বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ টর্চ।

- জরুরি রেডিও: মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও সংবাদ ও সরকারি নির্দেশনা পাওয়ার জন্য ব্যাটারিচালিত রেডিও।

- প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম: ফার্স্ট এইড কিট এবং নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ।

- নগদ অর্থ: ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ থাকলে জরুরি খরচ মেটানোর জন্য কিছু নগদ টাকা।

- অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী: মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, পরিচয়পত্রের কপি, প্রয়োজনীয় পোশাক ও স্বাস্থ্যসামগ্রী।

ফ্রান্সের সরকারি নির্দেশনায় ৭২ ঘণ্টার জরুরি কিটে জনপ্রতি ৬ লিটার পানির কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের নির্দেশনায় জনপ্রতি ৯ লিটার পানির পরামর্শ রয়েছে। অর্থাৎ পানির পরিমাণের ক্ষেত্রে দেশভেদে নির্দেশনা আলাদা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকদের প্রস্তুতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও জরুরি সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় কমিশন ‘ইইউ স্টকপিলিং স্ট্র্যাটেজি’ প্রকাশ করে। এর লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জরুরি পণ্য ও সরঞ্জামের মজুত, পরিবহন এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয় বাড়ানো।

এই পরিকল্পনায় ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, জ্বালানি, পানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো বড় সংকট দেখা দিলে যাতে একটি দেশ একা বিপর্যয় মোকাবিলা করতে বাধ্য না হয়, সে জন্য যৌথ প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতির ধরনও আলাদা।

ফিনল্যান্ড: দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। রাজধানী হেলসিংকিতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০টি বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে প্রায় ৯ লাখ মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

সুইডেন: দেশটিও নাগরিকদের যুদ্ধ ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে বিশেষ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলো বোঝাতে চাইছে, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সেনাবাহিনী বা সরকারের দায়িত্ব নয়; সাধারণ নাগরিকের প্রস্তুতিও সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন, ইউরোপ কি বড় কোনো যুদ্ধের আশঙ্কা করছে?

তবে ইউরোপীয় কমিশনের নীতিতে বিষয়টি শুধু যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, দাবানল, মহামারি, সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নাশকতার মতো সম্ভাব্য সব ধরনের সংকটকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের ঘোষণা বা আসন্ন বিপর্যয়ের নিশ্চিত সংকেত নয়। বরং যেকোনো বড় সংকটে প্রথম কয়েক দিন নাগরিকদের স্বনির্ভর থাকার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ।

ইউরোপের এই প্রস্তুতি বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সরু সড়ক বড় দুর্যোগের সময় উদ্ধার কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলতে পারে।

একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভবন ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ এবং হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরকারি উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশেও পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানির চাহিদা এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ বিবেচনায় নিয়ে আগাম পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

বিশেষ করে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—

- পরিবারভিত্তিক জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি।

- নিরাপদ পানীয় জল ও সংরক্ষণযোগ্য খাবারের ব্যবস্থা রাখা।

- প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা।

- বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা।

- ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও বন্যার সময় নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নিয়ম শেখা।

- স্থানীয় উদ্ধারকেন্দ্র ও জরুরি সেবার যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা।

সরকারি পর্যায়েও স্কুল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আবাসিক ভবন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

ইউরোপের ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে পরিবর্তিত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত করতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাই নাগরিকদের আগাম প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও জরুরি পণ্যের মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশের জন্যও এখান থেকে বড় শিক্ষা হলো, দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে। কারণ সংকটের প্রথম কয়েক ঘণ্টা ও দিনগুলোতে সচেতনতা, পারিবারিক পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে