×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

মুখে ইউয়ান, ব্যাংকে ডলার — ডাবল গেম ফাঁস

২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৬:৪৮:৪৯
মুখে ইউয়ান, ব্যাংকে ডলার — ডাবল গেম ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করায় ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে ডলারের বিকল্প মুদ্রাব্যবস্থার কথা জোরালোভাবে উঠে এলেও বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনো ডলারের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী।

তবে ডলারের আধিপত্য কমানোর ক্ষেত্রে চীনের কৌশল শুধু ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, লিথিয়াম ও সৌরবিদ্যুতের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে নতুন অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে চায় বেইজিং। অর্থনীতিবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় এই কৌশলকে অনেক সময় ‘গ্রিন ইউয়ান’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের (বিআইএস) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী।

বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের লেনদেনে ডলারের অংশ প্রায় ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের অংশ প্রায় ৭ শতাংশ। একইভাবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ডলারের প্রাধান্য রয়েছে। সেখানে ইউয়ানের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়লেও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ান এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন একদিকে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইলেও অন্যদিকে বর্তমান ডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নিজস্ব স্বার্থও অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

১. রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থ: চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপণ্য বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে রপ্তানি হয়। এসব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে পরিচালিত হওয়ায় ডলারের স্থিতিশীলতা চীনের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

২. পুঁজি নিয়ন্ত্রণের নীতি: ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অর্থের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু চীন দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণনীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটির সরকার চায় না, অবাধ অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাক এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ুক।

৩. ইউয়ানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা: বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে একটি মুদ্রার ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের আস্থা থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে চীনের আর্থিক বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, মুদ্রার বিনিময়যোগ্যতা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে।

ফলে ডলারের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করলেও ইউয়ানকে পুরোপুরি অবাধ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রায় রূপান্তর করা চীনের জন্য সহজ নয়।২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চীনের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের পর রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি দেশটির কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনব্যবস্থা সুইফটের (SWIFT) বাইরে রাখা হয়।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য কীভাবে ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হতে পারে।

তাইওয়ান ইস্যুতে ভবিষ্যতে চীনের ওপরও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বেইজিং বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে চীন চালু করে ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম বা সিআইপিএস (CIPS)। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে দেশটি।

তবে সিআইপিএস এখনো পুরোপুরি সুইফটের বিকল্প হয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে এর সংযোগ ও কার্যক্রমে বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।

ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় জ্বালানি বাণিজ্যের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক তেলবাজারে ডলারের ব্যবহার আরও শক্তিশালী হয়। এ ব্যবস্থার সঙ্গে ‘পেট্রোডলার’ ধারণাটি জড়িয়ে যায়।

কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখন ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনকে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে চীন।

বৈশ্বিক ব্যাটারি উৎপাদন, লিথিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরিতে দেশটির বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে এসব পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজারে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের আর্থিক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

এই কৌশলকেই অনেকে ‘গ্রিন ইউয়ান’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও প্রযুক্তিপণ্যের বাণিজ্যে চীনা মুদ্রার প্রভাব বাড়ানো।এ ক্ষেত্রে ব্যাটারি, লিথিয়াম, সৌর প্যানেল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি হতে পারে চীনের কৌশলগত হাতিয়ার।

চীনের এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে দেশটির আধিপত্য। বৈশ্বিক ব্যাটারি উৎপাদন ও লিথিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং জ্বালানি সংরক্ষণের প্রযুক্তিতেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

বেইজিংয়ের লক্ষ্য শুধু এসব পণ্য উৎপাদন বা রপ্তানি করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, অর্থ পরিশোধ এবং বাণিজ্যিক লেনদেনেও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো।

এভাবে ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরিত হলে সেই পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীন নিজেদের মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

ডলার ও ইউয়ানের এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়।

বিশেষ করে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য আমদানিতে দেশটির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এলসি খোলার সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে বাস্তবে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক লেনদেনে ডলারের ব্যবহার এখনো বেশি। সরবরাহকারীদের পছন্দ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং মুদ্রার বিনিময়যোগ্যতার বিষয়গুলোও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারির বাজার সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য কমানো সহজ কোনো কাজ নয়। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতি, গভীর আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের আস্থা।

তবে চীনের কৌশলও দীর্ঘমেয়াদি। দেশটি সরাসরি ডলারকে উৎখাত করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ব্যাটারি ও প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোং ইউয়ান জোই লিউয়ের বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য কমে গেলে তার কারণ শুধু চীনের উত্থান হবে না; যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ও সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন লড়াই শুধু ডলার ও ইউয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই প্রতিযোগিতাও এর সঙ্গে যুক্ত। তেলের যুগে পেট্রোডলার যে প্রভাব তৈরি করেছিল, ব্যাটারি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির যুগে চীন কি তেমনই নতুন কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে