×
ঢাকা, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

সীমান্তে নতুন সমীকরণ; বদলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ!

২০২৬ নভেম্বর ০১ ১২:২১:১৮
সীমান্তে নতুন সমীকরণ; বদলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ!

নিজস্ব প্রতিবেদক: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ফুট উঁচুতে বরফশীতল বৈরী আবহাওয়া ও অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতির মধ্যেই ভারত-চীন সীমান্তে আবারও শুরু হয়েছে টানটান উত্তেজনা। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এবার পূর্ব সেক্টরের অরুণাচল সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী। যুদ্ধবিমান বা সাইরেনের কোনো শব্দ ছাড়াই পাহাড়ি সীমান্তে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সামরিক প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারনেট মাধ্যমে অরুণাচল সীমান্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, দুর্গম পাহাড়ের ঢালে দুই দেশের সেনাসদস্যরা মুখোমুখি ও অনড় অবস্থানে দাঁড়িয়ে একে অপরের পথ আটকে রয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, স্যাটেলাইট চিত্র ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) অতিক্রম করে ভারতের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই অনুপ্রবেশের ঘটনায় নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং অরুণাচল সীমান্তে আন্তর্জাতিক সামরিক পরিভাষায় পরিচিত ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল প্রয়োগ করছে। এই কৌশলে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ না করে একটু একটু করে প্রতিপক্ষের ভূমি কেটে নেওয়া হয়।উদাহরণস্বরূপ—চীনা বাহিনী নিঃশব্দে কোনো এলাকার ১০০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। এরপর উত্তেজনার মুখে আলোচনার টেবিলে বসে তারা সমঝোতার ভান করে ২৫ কিলোমিটার পিছিয়ে যায়, কিন্তু বাকি ৭৫ কিলোমিটার স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নতুন সীমান্তরেখা ঘোষণা করে। বিগত তিন-চার দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এভাবেই বেইজিং ভারতের হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের মানচিত্রে যুক্ত করে নিয়েছে বলে অভিযোগ।

বর্তমানে অরুণাচল সীমান্তে চীনের আগ্রাসনের মূল কেন্দ্রবিন্দু দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল:

১. তাকসিন (Taksin):এলএসি সংলগ্ন অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত চৌকি তাকসিন। সামরিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডমিনেটিং হাইটস’ (Dominating Heights)—যেমনটি সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে দখল বজায় রেখে পুরো অঞ্চলে নজরদারি চালায় ইসরায়েল। তাকসিনের পাদদেশ দিয়ে আসামে পানি সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ নদী প্রবাহিত হয়েছে। চীনা বাহিনী যদি এই পাহাড়ের চূড়ায় দীর্ঘপাল্লার আর্টিলারি বা রাডার ব্যবস্থা বসায়, তবে ভারতের আসামের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি ও জাতীয় মহাসড়ক পুরোপুরি চীনের সামরিক ফায়ারিং রেঞ্জের আওতায় চলে আসবে।

২. আসাফিলা (Asaphila):তাকসিনের অদূরে অবস্থিত আসাফিলা ঘন জঙ্গল ও দুর্গম উপত্যকায় ঘেরা আরেকটি ভূ-কৌশলগত অঞ্চল। ভৌগোলিক দূরত্ব অনুযায়ী, এই আসাফিলা পয়েন্টটি বাংলাদেশের সিলেট সীমান্ত থেকে মাত্র ৩২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আসাফিলার পাদদেশ দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্তকারী প্রধান মহাসড়ক চলে গেছে। পাহাড়ি চূড়ায় চীন যদি ৩০০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের আধুনিক রকেট লঞ্চার বা মিসাইল সিস্টেম স্থাপন করে, তবে এক বোতাম চাপলেই পুরো সেভেন সিস্টার্সের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হবে।

যুদ্ধের ময়দানে অন্যতম প্রধান শক্তি হলো দ্রুত রসদ ও সেনা পরিবহন (লজিস্টিকস)। এই জায়গায় ভারতের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে চীন:

চীন: তিব্বত ও এলএসি সীমান্ত পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালু করেছে বেইজিং। ফলে যুদ্ধকালীন সময়ে মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হাজার হাজার সৈন্য, ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ সীমান্তে এনে জড়ো করতে পারে তারা। এছাড়া সীমান্তজুড়ে রয়েছে ফাইভ-জি ইন্টারনেট, ভূগর্ভস্থ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক বাঙ্কার ও শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা।

ভারত: ভারতের দিকের পাহাড়ি সীমান্ত অবকাঠামো এখনও বেশ দুর্বল। ভূমিধসপ্রবণ সরু পাহাড়ি রাস্তা এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সীমান্তে জরুরি সামরিক রসদ ও ট্যাংক পৌঁছাতে ভারতীয় বাহিনীকে চরম বেগ পেতে হয়।

ভারতের মানসিক চাপের একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়। বলিউডের সিনেমায় পাকিস্তানকে অনায়াসে পরাজিত হতে দেখানো বা তীব্র জাতীয়তাবাদী বার্তা দেওয়া স্বাভাবিক বিষয় হলেও চীনের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ নিয়ে বলিউড মেগাস্টার সালমান খানের একটি বিগ বাজেটের সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও চীনকে চটানোর ভয়ে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এতে অলিখিত আপত্তি জানানো হয় বলে খবর বেরিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন সীমান্তে বাস্তবতার রণকৌশল সিনেমার পর্দার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও ভীতিকর।

আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হিমালয়ের এই অঞ্চল কয়েক ফুট বরফের চাদরে ঢেকে যাবে। তখন ভারতের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, আর বেইজিং ঠিক এই প্রাকৃতিক সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। কোনো প্রকার রক্তপাত বা সাইরেন ছাড়াই বরফে ঢাকা অরুণাচলের বুকে নিঃশব্দে এক নতুন মানচিত্রের জন্ম হচ্ছে, যা শুধু ভারত নয়—পরোক্ষভাবে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাহিদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে