×
ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

চীনের বিশাল বাজার ধরতে বাংলাদেশের জন্য ৬ বড় সুযোগ

২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৮:৩৮:২৩
চীনের বিশাল বাজার ধরতে বাংলাদেশের জন্য ৬ বড় সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং চীনের বিশাল বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে ছয়টি বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। এর আওতায় চীনের ইউনান প্রদেশে বিনামূল্যে ২ হাজার বর্গমিটারের গুদাম ও প্রদর্শনী হল ব্যবহারের সুযোগ, অনলাইন কমোডিটি মলে প্রবেশ এবং পণ্য পরিবহনে বিশেষ লজিস্টিক সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। এসব সুবিধা কার্যকর হলে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি নতুন ক্রেতা ও রপ্তানি আদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চীনের ‘থ্রি ফ্রি’ ও ‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ নীতির আওতায় বাংলাদেশকে এসব সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগগুলোর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) কাজ করছে। তবে সুবিধাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, ব্যবহারের শর্ত এবং সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চীনের ‘থ্রি ফ্রি’ নীতির আওতায় ইউনান প্রদেশে বাংলাদেশকে বিনামূল্যে ২ হাজার বর্গমিটারের গুদাম সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা কার্যকর হলে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য মজুত ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সুবিধা পেতে পারেন। এতে পণ্য সরবরাহের সময় কমানো এবং গুদাম পরিচালনার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

একই নীতির আওতায় বিনামূল্যে ২ হাজার বর্গমিটারের একটি অফলাইন প্রদর্শনী হল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথাও রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন, সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাজারের চাহিদা যাচাই করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের পণ্য, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে প্রদর্শনী হলটি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের অনলাইন কমোডিটি মলে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। এ সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সমন্বিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্যের উপস্থিতি বাড়লে নতুন ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, বাজার যাচাই এবং রপ্তানির সম্ভাবনা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতি গড়ে তোলা এবং প্রচলিত রপ্তানি বাজারের বাইরে নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এ সুবিধা থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে পণ্যের মান, মূল্য প্রতিযোগিতা, অনলাইন বিপণন, সরবরাহব্যবস্থা এবং চীনা ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।

‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ নীতির আওতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনের বাজারে প্রবেশ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট লজিস্টিক ও পরিবহন ফি মওকুফের সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের শাকসবজি, ফলমূলসহ পচনশীল কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য দ্রুত চীনের বাজারে পৌঁছাতে বিশেষ কাস্টমস সুবিধা ও দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থাও এ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ধরনের সুবিধা কার্যকর হলে পরিবহন ও সীমান্তে পণ্য খালাসের সময় কমতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে—এমন কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক মালবাহী ট্রেন ‘লানছাং-মেকং এক্সপ্রেস+’-এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে অংশীদার দেশগুলোর জন্য অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার বিষয়টি।

এ সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য কীভাবে কার্যকর হবে, কোন রুটে পণ্য পরিবহন করা যাবে এবং ব্যয় ও সময় কতটা কমবে—তা বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিস্তারিত শর্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে রেলভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে আঞ্চলিক বাণিজ্য সংযোগ বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মতো বড় বাজারে পণ্য প্রদর্শন, বিপণন ও পরিবহনে সহায়তা পাওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ। তবে শুধু অবকাঠামো বা লজিস্টিক সুবিধা পেলেই রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে না। চীনা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য নির্বাচন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ এবং ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন সংবাদমাধ্যম আমার দেশকে বলেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, লজিস্টিক ও নীতিগত সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে দায়িত্ব গ্রহণের পর চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরে সংগঠনটি।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা স্থাপন, চীনা বিনিয়োগে মানবসৃষ্ট তন্তু বা ম্যানমেইড ফাইবারের (এমএমএফ) কারখানা গড়ে তোলা, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে চীনা বিনিয়োগ, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো, চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন ও সংরক্ষণের জন্য বিনামূল্যে স্টোর ও গুদামের ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ।

বিসিসিসিআই সভাপতি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খোরশেদ আলম সংবাদমাধ্যম আমার দেশকে বলেন, গত বছরের অক্টোবরে চীনের কাছে ছয়টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি এসব উদ্যোগ নিয়ে কাজ এগিয়েছে। রপ্তানি সহজীকরণ, পণ্য প্রদর্শন ও উপস্থাপনের সুযোগ তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইপিবি কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়গুলো মূলত সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে সম্পন্ন হয় এবং ইপিবি ও চীন সরকারের মধ্যে আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে।

তিনি বলেন, বিনা ভাড়ায় প্রদর্শনী ও গুদাম ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া গেলে সেখানে বাংলাদেশি ও চীনা কর্মী রেখে পণ্য প্রদর্শন, বিক্রি এবং বাজারের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোন পণ্য নিয়ে চীনের বাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশ করা যায়, তা নির্ধারণেও এ উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে।

খোরশেদ আলম আরও বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং বছরে অন্তত ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন, বাজার যাচাই এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

চীনের প্রস্তাবিত সুবিধাগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গুদাম, প্রদর্শনী হল, অনলাইন বিপণন ও পরিবহন সহায়তা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশের প্রাথমিক বাধা কমাতে পারে।

তবে এসব সুবিধার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সময়সীমা, যোগ্যতা ও ব্যবহারের শর্ত, পণ্য নির্বাচন এবং রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতির ওপর। সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং চীনের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে