×
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

শিল্প-প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন: কেন এগোতে পারছে না শেয়ারবাজার?

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১৮:৫৫:৫২
শিল্প-প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন: কেন এগোতে পারছে না শেয়ারবাজার?

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে হঠাৎ হঠাৎ সূচকের লাভ আর লেনদেনের ঝলক দেখা গেলেও, মূল উদ্দেশ্যেই থেকে যাচ্ছে বড় শূন্যতা। শেয়ারবাজারে যে প্রবৃদ্ধি বা জোয়ার দেখা যায়, তা দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগান দিতে কতটা কার্যকর—তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়লেও, সেই গতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। শুরু হয় টানা দরপতন আর লেনদেনের মন্দা। আজ ২৫ অক্টোবর সূচক কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৩২ পয়েন্টে, আর লেনদেন নেমেছে ৪৩০ কোটি টাকায়।

তবে সূচকের এই সাময়িক জোয়ার-ভাটার চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে শেয়ারবাজারের মূল সক্ষমতায়। শেয়ারবাজার এখনো শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন ফান্ড তৈরি করতে পারছে না। ফলে নতুন কলকারখানা স্থাপন কিংবা ব্যবসার পরিধি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের শেষ পর্যন্ত ঘুরতে হচ্ছে উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণের পেছনেই, যা তাঁদের সুদ ব্যয় ও সার্বিক আর্থিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিনশেষে সূচকের কৃত্রিম উত্থান নয়, বরং শিল্পায়নের চাকা সচল রাখতে নতুন মূলধন উত্তোলনের সুযোগ বাড়ানো না গেলে দেশের শেয়ারবাজার তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে বারবার ব্যর্থই থেকে যাবে।

বাজারের আকার বাড়লেও মূলধন সংগ্রহ সীমিত

চলতি বছরের জুন শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দেশের শেয়ারবাজারের মূলধনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক বছর আগে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ। শেয়ারের দাম বাড়লে বাজার মূলধন বাড়ে, কিন্তু তাতে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন অর্থের জোগান নিশ্চিত হয় না।

একটি কার্যকর শেয়ারবাজারের জন্য নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি, নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য সিকিউরিটিজ এবং বাজারে তারল্য বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশে সঞ্চয় থাকলেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে প্রবাহিত করার কার্যকর মাধ্যম এখনো সীমিত।

বন্ড ও পেনশন তহবিলে বড় সম্ভাবনা

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমাতে করপোরেট বন্ড বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বাজারের বিকাশে নির্ভরযোগ্য ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ ক্রেডিট রেটিং, বিভিন্ন মেয়াদের বন্ড এবং সক্রিয় মাধ্যমিক বাজার প্রয়োজন। বাংলাদেশে করপোরেট বন্ডের লেনদেন এখনো সীমিত থাকায় বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও সংকুচিত।

অন্যদিকে, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও পেনশন তহবিল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বড় উৎস হতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এসব তহবিলের সম্ভাব্য আকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। কিন্তু অর্থের বড় অংশ ব্যাংক আমানত ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন ট্রাস্টি এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগনীতি নিশ্চিত করা গেলে এসব তহবিল থেকে শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নীতিমালার পাশাপাশি প্রয়োজন আস্থার সংস্কার

গত ১৮ অক্টোবর ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলস, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ সহজ হলেও এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান শেয়ার হস্তান্তর হলে কোম্পানির হাতে নতুন মূলধন আসে না। তাই নতুন ইক্যুইটি ইস্যু, রাইট শেয়ার এবং করপোরেট বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

তবে শুধু অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ করা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের অপব্যবহার ঠেকানো এবং শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্বল কোম্পানির মান যাচাই না করে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

শেয়ারবাজারকে কার্যকর করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কর-সুবিধার মাধ্যমে ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বন্ডের লেনদেন বাড়ানো এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রকাশ্যে তুলে ধরাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, শেয়ারবাজারের সাফল্য শুধু সূচকের উত্থান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বাজারকে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অর্থায়ন-ব্যবস্থায় পরিণত করতে হলে নতুন মূলধন সংগ্রহ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে