×
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ঘড়ি ছাড়াই জীবনযাপনের দাবি, পরে জানা গেল ভিন্ন এক গল্প

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১৬:৩৮:২৯
ঘড়ি ছাড়াই জীবনযাপনের দাবি, পরে জানা গেল ভিন্ন এক গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক: পৃথিবীতে এমন একটি দ্বীপ রয়েছে, যেখানে বছরের প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত যায় না। মধ্যরাতেও আকাশে সূর্য দেখা যায়, চারপাশ থাকে দিনের মতো আলোকিত। নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ সোমারয় প্রকৃতির এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। একসময় দ্বীপটিকে বিশ্বের প্রথম ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে গড়ে তোলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে বাস্তবে সেখানকার বাসিন্দারা ঘড়ির নিয়ম ছাড়াই জীবনযাপন করেন কি না, তার গল্প কিছুটা ভিন্ন।

নরওয়ের ট্রমসো শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত সোমারয়। মাছ ধরার জন্য পরিচিত এই দ্বীপে প্রায় ৩০০ মানুষের বসবাস। চারপাশে পাহাড়, সমুদ্রের খাঁড়ি, ছোট ছোট বন্দর আর রঙিন বাড়িঘর দ্বীপটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে।

২০১৯ সালে সোমারয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন প্রচার করা হয়েছিল, দ্বীপটির বাসিন্দারা ঘড়ির প্রচলিত নিয়ম থেকে বেরিয়ে এসে সময়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই জীবনযাপন করতে চান। গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ সময় সূর্য অস্ত না যাওয়ায় তাঁরা দিন ও রাতের প্রচলিত হিসাবের বাইরে জীবন কাটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রচারণার অংশ হিসেবে দ্বীপের কাছের একটি সেতুর রেলিংয়ে বেশ কিছু হাতঘড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। স্থানীয় এক হোটেলমালিক বাসিন্দাদের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র নরওয়ের পার্লামেন্টের এক সদস্যের কাছেও জমা দেন।

তবে পরে জানা যায়, এই উদ্যোগের পেছনে ছিল নরওয়ের সরকারি পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনোভেশন নরওয়ে’। মূলত পর্যটকদের আকৃষ্ট করতেই ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ ধারণাটি প্রচার করা হয়েছিল। দ্বীপের অল্প কয়েকজন বাসিন্দা এতে যুক্ত থাকলেও অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংস্থাটির প্রধানকে ক্ষমা চাইতে হয়। পরে সেতু থেকে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে সোমারয় বিশ্বের প্রথম সময়মুক্ত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আর দ্বীপটির বাসিন্দারাও ঘড়ির নিয়ম বাতিল করেননি।

আর্কটিক বৃত্তের উত্তরে অবস্থিত সোমারয়ে প্রতিবছর ১৮ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ে মধ্যরাতেও আকাশে সূর্য দেখা যায়। ফলে দিন ও রাতের স্বাভাবিক পার্থক্য অনেকটাই হারিয়ে যায়। এ ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনাকে ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্য বলা হয়।

গ্রীষ্মের বিপরীতে শীতকালে দ্বীপটিতে দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না। দিনের বেলাতেও চারপাশ অন্ধকার থাকতে পারে। বছরের বিভিন্ন সময়ে আলো ও অন্ধকারের এই বড় পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

তবে প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্য থাকলেও সোমারয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি সময়ের নিয়মের বাইরে নয়। দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও স্কুল এখনো নির্ধারিত সময় মেনেই পরিচালিত হয়।

দ্বীপে বেড়াতে যাওয়া পোলিশ পর্যটক এভা কাচিনস্কির কাছে ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হওয়ার প্রচারণাটি ছিল আকর্ষণের বড় কারণ। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য ঘড়ির হিসাব ভুলে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর আশায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

কিন্তু সোমারয়ে পৌঁছে দেখেন, সেখানেও দোকান ও রেস্তোরাঁ নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষও সারা রাত খোলা থাকে না। এতে প্রথমে কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন তিনি।

পরে অবশ্য ফোন বন্ধ রেখে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটিয়ে স্বস্তি পান এভা। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সোমারয়ে সময়ের চাপ অন্য জায়গার তুলনায় কিছুটা কম বলে মনে হয়েছে।

ডাচ পর্যটক ওয়াউটার দে উইটও দ্বীপটির ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মধ্যরাতে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন, অথচ তখনো আকাশে সূর্য উজ্জ্বল ছিল। ঘড়ি না থাকলে সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ত।

সময়মুক্ত অঞ্চল নিয়ে প্রচারণায় দ্বীপটির অনেক বাসিন্দার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তাঁদের মতে, দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতে সময়ের হিসাব প্রয়োজন। তবে গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ সময় আলো থাকায় জীবনযাপনের ধরনে কিছুটা স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে।

স্থানীয় এক হোটেলকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালে দোকানে ক্রেতা না থাকলে মালিক মাছ ধরতে চলে যেতে পারেন। পরদিন স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুরাও রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। অনেকে ছুটিতে থাকায় জীবনযাত্রার গতিও কিছুটা ধীর হয়ে আসে।

তবে এই স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু হওয়ায় কিছু বাসিন্দা অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। পর্যটকদের অনেকে দ্বীপের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বদলে ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ ধারণা নিয়েই বেশি জানতে চাইতেন।

ওই হোটেলকর্মীর মতে, কয়েক বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। যদিও প্রচারণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সোমারয় পরিচিতি পেয়েছে।

গ্রীষ্মকালে গভীর রাতেও সোমারয়ের চারপাশ দিনের মতো আলোকিত থাকে। অথচ এ সময় রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য, বাড়িঘর নীরব এবং যানবাহনের চলাচলও কম থাকে। সূর্যের আলো দেখে সময় অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবু দ্বীপটির জীবনযাত্রা পুরোপুরি সময়ের নিয়মমুক্ত নয়। স্কুল, দোকান ও রেস্তোরাঁর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময় অনুসরণ করে। ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হওয়ার প্রচারণাটি মূলত পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ ছিল।

সোমারয়ের প্রকৃত বিশেষত্ব তাই ঘড়ির নিয়ম বাতিল করা নয়; বরং বছরের একটি বড় সময়ে সূর্যাস্ত ছাড়াই প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা। টানা প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত না যাওয়ার এই বৈশিষ্ট্যই দ্বীপটিকে পর্যটকদের কাছে ব্যতিক্রমী আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে