×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

বিনিয়োগকারীদের মোহভঙ্গ, চীনের শেয়ারবাজারে বড় পতন

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ২০:৪৯:০১
বিনিয়োগকারীদের মোহভঙ্গ, চীনের শেয়ারবাজারে বড় পতন

নিজস্ব প্রতিবেদক: চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। দেশটির সাংহাই ও শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৩০০ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গঠিত সিএসআই ৩০০ সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদে ভাটা, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের দুর্বলতা এবং সরকারের নতুন প্রণোদনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারে চাপ তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) লেনদেনের একপর্যায়ে সিএসআই ৩০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচকটির পতন প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছানোয় বাজারটি প্রযুক্তিগতভাবে ‘বিয়ার মার্কেট’ বা দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী বাজারের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একই দিনে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন দেখা যায়।

এআই খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদে ভাটা

চীনের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পকে শক্তিশালী করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ চলতি বছরের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি করেছিল। এর ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এআই কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্যের সঙ্গে প্রকৃত আয় ও মুনাফার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিনিয়োগকারীরা এখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি কোম্পানিগুলো সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কতটা আয় ও মুনাফা করতে পারছে, সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রত্যাশার তুলনায় মুনাফা কম বাড়লে শেয়ারের দাম সংশোধনের মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় চীনের প্রযুক্তি খাতের ওপর বাড়তি প্রভাব পড়ছে।

দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য শেয়ারবাজার থেকে নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্বল ভোগব্যয় বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক উদ্বেগ

চীনের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে থাকলেও সাধারণ মানুষের ব্যয় করার প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। ভোক্তাদের ব্যয় কম থাকলে খুচরা বিক্রি, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা এবং ভোক্তানির্ভর ব্যবসার আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ভালো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বজায় রয়েছে। তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ভালো হলেই সব কোম্পানির আয় ও মুনাফা একই হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিনিয়োগকারীরা চান, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল যেন সাধারণ মানুষের ব্যয় বৃদ্ধি, কোম্পানির আয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়। এসব ক্ষেত্রে স্পষ্ট উন্নতি না হলে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

সরকারি প্রণোদনা নিয়ে অনিশ্চয়তা

চীনের শেয়ারবাজারে আগের উত্থানের পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আশা করছিলেন, অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকার বড় আকারের নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করবে।

তবে নতুন করে ব্যাপক সহায়তা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলনামূলক ভালো হওয়ায় বড় ধরনের প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নীতিনির্ধারকদের হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

চীনা কর্তৃপক্ষ শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ কমানো এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকারি সহায়তায় সাময়িকভাবে শেয়ারের দাম স্থিতিশীল হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি, ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ানো এবং ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাটলের মুনাফা নিয়েও উদ্বেগ

চীনের বড় ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি—ক্যাটলের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। এর পর বুধবার কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুনাফার ওপর চাপ এবং প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছেন। ক্যাটলের দরপতনের প্রভাব ব্যাটারি, জ্বালানি ধাতু এবং নতুন জ্বালানিনির্ভর কোম্পানির শেয়ারেও পড়েছে।

এ ঘটনা চীনের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ব্যয়ের চাপের কারণে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

দরপতনের পরই কি বিনিয়োগের সুযোগ?

শেয়ারের দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেলে অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে বাজারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। তবে দরপতন হলেই কোনো শেয়ার আকর্ষণীয় বিনিয়োগে পরিণত হয় না। কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়, মুনাফা, পণ্যের চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ভিলওয়ারিয়াফিনসার্ভের অংশীদার অভিষেক ভিলওয়ারিয়া বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কোম্পানিগুলোর আয় এবং সরকারি নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে তাঁদের মনোভাব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাঁর মতে, চীনের কিছু শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে শুধু দরপতনের কারণে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

চীনের শেয়ারবাজারে টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সাময়িক উত্থান বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট হবে না।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে