×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ওয়াশিংটনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ চালে কোণঠাসা মোদি সরকার

২০২৬ অক্টোবর ২২ ২১:১৫:২৫
ওয়াশিংটনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ চালে কোণঠাসা মোদি সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক ও আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকমেইলিং নেটওয়ার্কের হোতা জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর একটি গোপন বৈঠকের ছবি প্রকাশ্যে আসার পর ভারতীয় রাজনীতিতে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিওজে) নথিপত্র থেকে ছবিটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া ও ওয়াশিংটনের হাতে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর একটি বিস্ফোরক টুইট শুধু ক্ষমতাসীন বিজেপি নয়, দেশটির কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের অন্দরমহলেও চরম অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বুনে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনে মার্কিন বিচার বিভাগের আর্কাইভে সংরক্ষিত নথিপত্র থেকে সম্প্রতি একটি ছবি অনলাইনে প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, একান্তে বসে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে গোপন আলাপে মগ্ন জেফরি এপস্টিন ও ভারতের বর্তমান তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া এপস্টিনের কুখ্যাত প্রাইভেট দ্বীপে বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদদের গোপন ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার ইতিহাস আন্তর্জাতিক মহলে বহুল আলোচিত। সেই বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে খোদ ভারতের অন্যতম ক্ষমতাধর মন্ত্রীর ছবি প্রকাশ হওয়ায় দিল্লির সাউথ ব্লকে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

হরদীপ সিং পুরী ভারতের কোনো সাধারণ মন্ত্রী নন; তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের একজন।সাবেক এই কূটনীতিককে মোদি তাঁর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে ছাড় মূল্যে তেল কেনা এবং ভারতের আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের মূল কলকাঠি নাড়েন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে হরদীপ পুরী হলেন মোদির দুর্ভেদ্য ঢাল। ফলে পুরীর মতো ব্যক্তিকে আঘাত করার অর্থ সরাসরি নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতার মূলে আঘাত হানা।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের ঠিক একই সময়ে ছবিটি প্রকাশ হওয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আক্রমণ শানান লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সরাসরি বিজেপি ও আরএসএস কর্মীদের উদ্দেশে তিনি লেখেন:"রুবিও মুম্বাই পৌঁছাল। মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) এপস্টিন আর পুরীর ছবি প্রকাশ করল। প্রিয় বিজেপি ও আরএসএস কর্মীরা, আপনাদের কী মনে হয়—ওরা কোন দেশবিরোধী গাদ্দারকে ব্ল্যাকমেইল করছে?"

রাহুলের এই বক্তব্য কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আক্রমণ নয়; বরং এটি ছিল এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘কঠোর দেশপ্রেমিক’ দাবি করা আরএসএসের তৃণমূল কর্মীদের মনে তিনি এই প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে—মোদি সরকার কি তবে ওয়াশিংটনের কোনো গোপন ব্ল্যাকমেইলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে?

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনীতিতে কোনো কিছুই কাকতালীয় নয়:

১. মার্কিন ক্ষোভ: রাশিয়া থেকে ভারতের অবাধে তেল কেনা, ব্রিকস (BRICS)-এ ভারতের ডলারবিরোধী আলোচনা এবং সম্প্রতি চীনের সঙ্গে লাদাখ সীমান্তে সমঝোতা চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে মোদি সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

২. কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন ভারতে পা রাখলেন, ঠিক তখনই এই ছবি প্রকাশ করে ওয়াশিংটন মোদি সরকারকে একটি শীতল বার্তা দিল—‘আমরা তোমাদের মন্ত্রীদের অন্ধকার অতীত জানি; আমাদের শর্ত না মানলে আরও গোপন ফাইল বের হবে।’

হরদীপ সিং পুরীর এই ছবি নিছক কোনো ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়; এটি মোদি সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক বিশাল বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল দাবায় ভারত আজ চালকের আসন হারিয়ে পরাশক্তির চালে আটকা পড়া ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে কি না—সেই বড় প্রশ্নটিই এখন দিল্লির রাজপথ থেকে সংসদের অন্দরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে