×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, জেদ্দা কনস্যুলেটের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

২০২৬ অক্টোবর ২২ ২০:৪৬:৩৬
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, জেদ্দা কনস্যুলেটের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ঘটনায় জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়া, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মিশন কতটা সক্রিয় ছিল, তা নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, দুই বাংলাদেশি তিন বছরেরও বেশি সময় সৌদি আরবে কারাবন্দি থাকলেও তাঁদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবারকে কীভাবে জানানো হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কনস্যুলেট কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটের বক্তব্য ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য যাচাই করা জরুরি।

প্রকাশিত অনুসন্ধানী তথ্যের বরাতে দাবি করা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কাছে বন্দিদের একটি তালিকা হস্তান্তর করে। ওই তালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম এবং তাঁদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ ও অনৈতিক সম্পর্কসংক্রান্ত অভিযোগের উল্লেখ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম থাকার পরও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ, মামলার অবস্থা যাচাই, আইনজীবী নিয়োগ কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ও কনস্যুলার দায়িত্ব পালনে গুরুতর ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসবে।

তবে কনস্যুলেট তালিকা পাওয়ার পর বাস্তবে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বন্দিদের বিষয়ে আগে থেকে জানতেন কি না এবং আইনি সহায়তার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, তাঁর পরিবারকে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা, স্থানীয় আইন অনুযায়ী আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া কনস্যুলার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আন্তর্জাতিক কনস্যুলার বিধান অনুযায়ী, বিদেশে আটক নাগরিকদের ক্ষেত্রে কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ ও সংশ্লিষ্ট অধিকার প্রযোজ্য নিয়মের আলোকে বিবেচিত হয়। তবে কনস্যুলেটের যোগাযোগ বা আইনি সহায়তা থাকলেই কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ড ঠেকানো সম্ভব হতো—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। মামলার প্রমাণ, সৌদি আরবের আইন, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং আপিলের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।

এ কারণে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মামলায় কনস্যুলেটের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য জানতে হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে এগিয়েছে, তাঁরা আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল বা অন্য কোনো আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ ছিল কি না।

সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার, বিচার বা গুরুতর দণ্ডের মুখোমুখি হলে তাঁর আইনি অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশিত।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো, বিদেশে আটক কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যথাসময়ে কনস্যুলার সহায়তা পাচ্ছেন কি না এবং তাঁর পরিবার প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারছে কি না। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ বা মৃত্যুদণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, আইনি সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু দুই পরিবারের জন্য নয়, বিদেশে থাকা অন্য বাংলাদেশিদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়াবে।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বজনদের প্রশ্ন, তাঁরা বিদেশে বিপদের মুখে পড়লে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল এবং সেই সহায়তা যথাসময়ে দেওয়া হয়েছিল কি না।

এ ঘটনায় কনস্যুলেটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শ্রম উইংয়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য আইনি সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হচ্ছে।

ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বন্দিদের তালিকা পাওয়ার পর কনস্যুলেট কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার নথি প্রকাশ বা যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দুই বাংলাদেশির বিচার, রায় ও আপিলের সুযোগ সম্পর্কে তাঁদের পরিবারকে কখন এবং কীভাবে জানানো হয়েছিল, তা তদন্ত করা দরকার। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশন দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য কনস্যুলার যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গুরুতর দণ্ডের মামলাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক মিশনের জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হলে দায় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আর ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যেন যথাসম্ভব আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে