×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

দেশ ছেড়ে পালাতে প্রাইভেট জেট ভাড়ায় নজিরবিহীন কাড়াকাড়ি

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১৭:১১:০৯
দেশ ছেড়ে পালাতে প্রাইভেট জেট ভাড়ায় নজিরবিহীন কাড়াকাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার পর সৌদি আরবে বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ছাড়তে আগ্রহী ধনী ব্যক্তি, কূটনীতিক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ বা প্রাইভেট জেট ভাড়া নেওয়ার চাহিদা বেড়েছে।

চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন চার্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারের তথ্য অনুযায়ী, সংকটের আগে যে ভাড়ায় প্রাইভেট জেট পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং যুদ্ধঝুঁকির কারণে উড়োজাহাজ পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা, ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন

অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। ইয়েমেনের হুথিরা বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছিল। হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল করে।

লুফথানসা, এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগোসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্স রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরটি সীমিত পরিসরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য পুনরায় চালু হলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসেনি। বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বাতিলের সময়সীমাও এক নয়।

বিকল্প বিমানবন্দর থেকে প্রাইভেট জেটে দেশ ছাড়ার চেষ্টা

রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কিছু যাত্রী বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। তাঁদের মধ্যে আল-কাসিম অঞ্চলের বিমানবন্দর থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ইউরোপসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার চাহিদা বেড়েছে।

ব্যক্তিগত বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে কিছু অপারেটর সৌদি আরবে ফ্লাইট পরিচালনা সীমিত করেছে। ফলে একদিকে যাত্রীর চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে ভাড়ায় পাওয়া যায় এমন উড়োজাহাজের সংখ্যা কমেছে। এই দুই কারণে চার্টার ফ্লাইটের দাম দ্রুত বেড়েছে।

জেনেভাগামী প্রাইভেট জেটের ভাড়া ৬০ হাজার থেকে ৯৪ হাজার ইউরো

ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া দেওয়ার প্রতিষ্ঠান লাক্স জেটসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যাওয়ার জন্য ১৪ আসনের একটি বোম্বার্ডিয়ার উড়োজাহাজের ভাড়া এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৬০ হাজার ইউরো থেকে বেড়ে ৯৪ হাজার ইউরোতে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ, একই রুটে ভাড়া বেড়েছে ৩৪ হাজার ইউরো বা প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বৃদ্ধি সৌদি আরব থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে যাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার একটি উদাহরণ।

ইউরোপগামী কিছু প্রাইভেট জেটের ভাড়া প্রায় দেড় লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্যও সামনে এসেছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তুলনামূলক কাছের গন্তব্যে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া করতে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তবে রুট, উড়োজাহাজের ধরন, আসনসংখ্যা ও প্রাপ্যতার ওপর প্রকৃত ভাড়া নির্ভর করে।

যুদ্ধঝুঁকির বিমায় বাড়ছে পরিচালন ব্যয়

প্রাইভেট জেটের ভাড়া বৃদ্ধির পেছনে যুদ্ধঝুঁকির বিমা বা ‘ওয়ার রিস্ক ইনস্যুরেন্স’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বিমান পরিচালনার ঝুঁকি বেড়ে গেলে বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আরোপ করতে পারে। পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে গেলে সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়।

এর সঙ্গে উড়োজাহাজের অবস্থান পরিবর্তন, বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার এবং যাত্রার পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ভাড়া আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। তবে বিমার অতিরিক্ত খরচ সব ফ্লাইটে সমান নয়; রুট ও ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী তা পরিবর্তিত হয়।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। কিছু প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া বা বিকল্প কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয় বিবেচনা করছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে সৌদি আরব থেকে ব্যাপক হারে বিদেশিদের দেশত্যাগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করার জন্য আরও নির্ভরযোগ্য ও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন।

পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?

হুথিদের হামলার পর সৌদি আরবের বিমান চলাচলে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপত্তা উদ্বেগ, ফ্লাইট বাতিল এবং প্রাইভেট জেটের বাড়তি ভাড়া আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও চাপ সৃষ্টি করছে।

রিয়াদের বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালু হলেও স্বাভাবিক বিমান চলাচল পুরোপুরি ফিরেছে কি না, তা নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও এয়ারলাইন্সগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প রুট ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের উচ্চ ভাড়ার চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে