×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

গ্রাহকদের টাকা দিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১১ শর্ত

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১৬:৪৬:০৯
গ্রাহকদের টাকা দিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১১ শর্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অবশেষে সাধারণ গ্রাহকদের গচ্ছিত টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টি বা জামানতের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পেয়ে স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরছে ব্যাংকটি। তবে এই বিশেষ তহবিলের অপব্যবহার রুখতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর ১১টি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এসব নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো—বর্তমান বা প্রাক্তন পরিচালকদের আমানত পরিশোধ এবং নতুন করে কোনো ঋণ বিতরণে এই টাকা ব্যবহার না করা নিশ্চিত করা।

বিগত ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটি দৈনন্দিন কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি আটকে থাকা আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ শুরু করে। প্রথম আলো ইংলিশের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার আমানতকারী ২০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার জন্য ব্যাংকে আবেদন জমা দিয়েছিলেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া বিধিনিষেধ

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, বিশেষ এই ঋণ তহবিল থেকে কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের বর্তমান কিংবা সাবেক পরিচালকদের আমানতের টাকা দেওয়া যাবে না। এমনকি পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা নতুন বিনিয়োগ প্রদান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শর্তাবলীতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, এই তহবিল দিয়ে নতুন ঋণ অনুমোদন, আগের ঋণের সীমা বৃদ্ধি বা অনুমোদিত ঋণের অবশিষ্ট অংশ ছাড় করা যাবে না। একই সঙ্গে অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ/বিনিয়োগ কিনে নেওয়া বা আন্তব্যাংক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া, লভ্যাংশ প্রদান পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে এবং ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কোনোভাবেই আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। এমনকি তহবিলের টাকা পরিচালন খরচ মেটাতেও খরচ করা নিষিদ্ধ। আর এই অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার সাপ্তাহিক প্রতিবেদন নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে।

সোনালী ব্যাংকের ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ

ব্যাংকটির দৈনন্দিন কাজ সচল করা এবং আমানতকারীদের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য বাড়ানোর অংশ হিসেবে শতভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিতে ৩ মাসের জন্য ১০ শতাংশ সুদে ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। এর আগে ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সাথে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে গ্রাহকদের আস্থা রক্ষা এবং পাওনা মেটানোর বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

টাকা উত্তোলনে অগ্রাধিকার ও পদ্ধতি

বর্তমানে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবধারী যেসব সাধারণ গ্রাহক আগে টাকা তোলার আবেদন করেছিলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক প্রথম ধাপে তাঁদের পাওনা মেটাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আমানতকারীদের টাকাও পরিশোধ করা হবে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবু জাফর জানান, গ্রাহকদের বাস্তব চাহিদা বিবেচনা করে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ ও নেতৃত্বে রদবদলের পর টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক কিছুটা কমেছে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকিং মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রমও আবার গতি পেতে শুরু করেছে। তবে আবেদনে উল্লিখিত পুরো অর্থ সবাই একসাথে পাবেন এমন নয়; শাখাগুলোর দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয়ভাবে টাকা সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি নির্ভর করছে ব্যাংকটির সার্বিক তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর।

যে কারণে সংকটে ন্যাশনাল ব্যাংক

দেশের অন্যতম প্রাচীন এই বেসরকারি ব্যাংকটি গত কয়েক বছর ধরেই আর্থিক জালিয়াতি, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং তারল্য খরায় ধুঁকছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি ২,২৮৬ কোটি টাকা লোকসান গণনা করে। রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মূলধনের চরম ঘাটতি ব্যাংকের স্থায়িত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তাৎক্ষণিক সহায়তা সাধারণ গ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ন্যাশনাল ব্যাংককে টিকে থাকতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক খাত ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফেরানোর বিকল্প নেই। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকদের ক্ষুণ্ন হওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ১১টি শর্তের কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংক কতটা দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে