×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

মুনাফায় ফিরেছে ডেসকো, তারপরও যে কারণে বড় অনিশ্চয়তা

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১২:৪৯:০৮
মুনাফায় ফিরেছে ডেসকো, তারপরও যে কারণে বড় অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসানের চাপ কাটিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফায় ফিরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (ডেসকো)। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন নিরীক্ষক। আর্থিক সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংকে ডেসকোর ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) আটকে রয়েছে। এসব অর্থ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে কোনো সঞ্চিতি রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

ডেসকোর আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডেসকো ৪৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ১২৫ কোটি টাকা, শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৩ টাকা ১৫ পয়সা।

প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায় ফেরার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে স্থায়ী আমানতের সুদ আয় এবং বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসান না থাকা। অর্থবছরটিতে এফডিআর থেকে সুদ আয় আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ১২৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

ডেসকোর বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৭৫৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা হয়েছে একটি সুরক্ষিত ওভারড্রাফট সুবিধার বিপরীতে।

ছয় ব্যাংকে আটকে ১১৪ কোটি টাকা

নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডেসকোর ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ২০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকে ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৩৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ২০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট এবং আমানতের অর্থ ও সংশ্লিষ্ট সুদ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে এসব আমানতের বিপরীতে সুদ আয় হিসাবভুক্ত করা বন্ধ রেখেছে ডেসকো। তবে সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে কোনো সঞ্চিতি রাখা হয়নি।

নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) ৯ অনুযায়ী সন্দেহজনক আর্থিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অবচয় বা লোকসান স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে ডেসকোর সম্পদ ও মুনাফা ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখা হলে ঘোষিত মুনাফার পরিবর্তে লোকসান হতে পারত এবং নিট সম্পদমূল্য ও শেয়ারপ্রতি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট ব্যক্তিগত আমানতকারী বা অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আমানত ও বিনিয়োগের অর্থ সুদ ছাড়া ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে নিরীক্ষক জানিয়েছেন। নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে ডেসকো।

বিহারি ক্যাম্পের কাছে পাওনা ৩১২ কোটি টাকা

ডেসকোর আর্থিক ঝুঁকির আরেকটি বড় দিক হলো গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের কাছে মোট পাওনা ছিল ৫৩৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আদায় অনিশ্চিত বা অনাদায়যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন নিরীক্ষক।

এই অর্থের মধ্যে বিহারি ক্যাম্পের কাছে পাওনা ৩১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাতে পাওনা ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বিহারি ক্যাম্পের বকেয়া জমে থাকলেও তা হিসাবের খাতায় বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে, অনাদায়যোগ্য পাওনার বিপরীতে ডেসকো মাত্র ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা সঞ্চিতি রেখেছে। নিরীক্ষকের হিসাবে, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে ৩১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বেশি এবং অর্থবছরের লোকসান কম দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন বছর লোকসানের পর মুনাফা

বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা তিন বছর লোকসান করেছে ডেসকো। ওই তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান জমেছে ১ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসান ছিল ৮৪০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) ঋণের ক্ষেত্রে কোনো বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লাভ বা লোকসান হয়নি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন এবং ২০২৬ সালের ৩০ জুন—উভয় দিনেই ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা ছিল। অন্যদিকে জাপানি ইয়েনের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে জাইকার ঋণের বিপরীতে ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রাজনিত মুনাফা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ বাড়লেও আয় কমেছে

ডেসকোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা বিদ্যুতের মোট মূল্য প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৭৭৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণ থেকে আয় ১ শতাংশ কমে ৬৪১ কোটি টাকায় নেমেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় এবং হুইলিং চার্জ বেড়ে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থবছরটিতে ডেসকোর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারও বেড়েছে। মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ৭ হাজার ১১৩ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৪৪৪ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহকদের অংশ ৪৭ দশমিক ১১ শতাংশ, বাণিজ্যিক ও অফিস গ্রাহকদের ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং শিল্প গ্রাহকদের ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।

পরিশেষে বলা যায়, এফডিআর থেকে সুদ আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান না থাকায় ডেসকো মুনাফায় ফিরলেও আটকে থাকা আমানত ও বিপুল অনাদায়যোগ্য পাওনা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণীর নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রকৃত মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে